সনাতন ধর্মে পিতৃ পক্ষকে শ্রদ্ধা, স্মরণ ও কৃতজ্ঞতার পবিত্র সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি এমন একটি বিশেষ সময়, যখন মানুষ তাঁর পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং তাঁদের উদ্দেশ্যে তর্পণ, শ্রাদ্ধ, পিণ্ডদান ও দান-পুণ্য করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পিতৃ পক্ষে শ্রদ্ধার সঙ্গে সম্পাদিত কর্মের মাধ্যমে পিতৃপুরুষরা তৃপ্ত হন এবং তাঁদের আশীর্বাদ পরিবারের উপর বজায় থাকে।
পিতৃ পক্ষের শেষ তিথিকে সর্ব পিতৃ অমাবস্যা বলা হয়। এই অমাবস্যা সকল পরিচিত ও অজ্ঞাত পিতৃপুরুষের স্মরণের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। যাঁদের পূর্বপুরুষের শ্রাদ্ধ তিথি জানা নেই অথবা কোনো কারণে নির্ধারিত তিথিতে শ্রাদ্ধ করা সম্ভব হয়নি, তাঁদের জন্য এই দিনে শ্রদ্ধার সঙ্গে তর্পণ, শ্রাদ্ধ, পিণ্ডদান ও দান করার প্রথা রয়েছে।
২০২৬ সালে সর্ব পিতৃ অমাবস্যা ১০ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার পালিত হবে। অমাবস্যা তিথি ৯ অক্টোবর রাত ৯:৩৫ মিনিটে শুরু হয়ে ১০ অক্টোবর রাত ৯:১৯ মিনিট পর্যন্ত থাকবে। উদয় তিথি অনুযায়ী ১০ অক্টোবর সর্ব পিতৃ অমাবস্যার শ্রাদ্ধ করা হবে।
এই দিনে সকালে স্নান করে পরিষ্কার পোশাক পরুন এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে পিতৃপুরুষদের স্মরণ করুন। পারিবারিক প্রথা ও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তর্পণ, শ্রাদ্ধ এবং অন্যান্য ধর্মীয় কর্ম সম্পাদন করুন। পিতৃপুরুষদের শান্তি ও সদ্গতির জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন।
সর্ব পিতৃ অমাবস্যা পিতৃ পক্ষের সমাপ্তির পবিত্র দিন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে করা শ্রাদ্ধ, তর্পণ, পিণ্ডদান এবং দানের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। যাঁদের পিতৃপুরুষের শ্রাদ্ধ তিথি জানা নেই, তাঁদের জন্যও এই দিনে শ্রদ্ধার সঙ্গে শ্রাদ্ধকর্ম করা যেতে পারে।
‘শ্রাদ্ধ’ শব্দটি শ্রদ্ধার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে করা প্রতিটি কর্মে বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে মনের শ্রদ্ধা, ভক্তি ও কৃতজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সনাতন ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। পিতৃ পক্ষ আমাদের এটিও স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমাদের বর্তমান জীবন আমাদের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা পরিবার, সংস্কার ও ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তাই সর্ব পিতৃ অমাবস্যায় তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা এবং তাঁদের উদ্দেশ্যে পুণ্যকর্ম করা আমাদের ধর্মীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যের একটি অংশ।
সর্ব পিতৃ অমাবস্যার দিন সকালে স্নান করে পরিষ্কার পোশাক পরুন এবং শান্ত মনে পিতৃপুরুষদের স্মরণ করুন। পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী তর্পণ, শ্রাদ্ধ অথবা পিণ্ডদান করুন। পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে খাবার প্রস্তুত করে শ্রদ্ধার সঙ্গে নিবেদন করুন এবং ব্রাহ্মণ ও প্রয়োজনমতো মানুষকে খাবার খাওয়ান।
নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্ন, বস্ত্র, ফল, তিল, গুড় ইত্যাদি দান করতে পারেন। গরুকে সবুজ ঘাস খাওয়ানো এবং দীপদান করাও এই দিনে করা পুণ্যকর্মগুলির মধ্যে গণ্য করা হয়।
এর পাশাপাশি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পাঠ, বিষ্ণু সহস্রনাম পাঠ, শ্রীহরির নামস্মরণ অথবা রুদ্রপাঠ করে পিতৃপুরুষদের শান্তির জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে পারেন। এই দিনে করা প্রতিটি কর্মে শ্রদ্ধা, সেবা ও পরোপকারের ভাব থাকা উচিত।
পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত অন্নের গুরুত্ব গরুড় পুরাণে এভাবে বলা হয়েছে-
যদাহারা ভবন্ত্যেতে পিতরো যত্র যোনিষু।
তাসু তাসু তদাহারঃ শ্রাদ্ধান্নেনোপতিষ্ঠতি॥
—গরুড় পুরাণ, প্রেতকল্প, অধ্যায় ২২৫, শ্লোক ১৯
অর্থ: পিতৃপুরুষরা যে যে যোনিতে অবস্থান করেন, সেই অনুযায়ী শ্রাদ্ধে নিবেদিত অন্নের মাধ্যমে তাঁদের খাদ্য প্রাপ্ত হয়।
এই শাস্ত্রীয় ভাবনা অনুযায়ী, পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধার সঙ্গে অন্ন নিবেদন করা শ্রাদ্ধকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সনাতন ধর্মে দানকে ত্যাগ, করুণা ও পরোপকারের একটি শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দান শুধু কোনো বস্তু ত্যাগ করা নয়, বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনমতো মানুষের জীবনে সাহায্য ও আনন্দ পৌঁছে দেওয়ার একটি মানসিকতা।
পিতৃ পক্ষে করা দান পিতৃপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। গরুড় পুরাণে শ্রাদ্ধ ও দানের সঙ্গে পিতৃপুরুষদের তৃপ্তির সম্পর্কের উল্লেখ রয়েছে। গ্রন্থে বলা হয়েছে, আত্মীয়-স্বজনরা শ্রদ্ধার সঙ্গে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে যে অন্ন, ধন ইত্যাদি দান করেন, তা পিতৃপুরুষদের কাছে পৌঁছায় এবং অন্ন, জল ও শাক ইত্যাদির মাধ্যমে যথাসাধ্য করা শ্রাদ্ধ পিতৃপুরুষদের তৃপ্তির জন্য হয়।
তাই সর্ব পিতৃ অমাবস্যায় করা দান শুধু পার্থিব প্রয়োজন পূরণের একটি মাধ্যম নয়, বরং পিতৃপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি সুযোগও। দান করার সময় মনে অহংকার থাকা উচিত নয়। নিজেকে বড় করে দেখানো দানের উদ্দেশ্য নয়; ঈশ্বরের দেওয়া সামর্থ্যকে প্রয়োজনমতো মানুষের সেবায় উৎসর্গ করাই দানের মূল ভাবনা হওয়া উচিত। প্রকৃত দানে শ্রদ্ধা, বিনয়, করুণা ও সেবার মনোভাব থাকা প্রয়োজন।
সর্ব পিতৃ অমাবস্যার পবিত্র উপলক্ষে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্ন, খাবার, বস্ত্র, ফল, তিল, গুড়, চাল, গম এবং ঘি ইত্যাদি দান করা যেতে পারে। প্রয়োজনমতো মানুষকে খাবার খাওয়ানো এবং তাঁদের প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতা করাও পুণ্যকর সেবা হিসেবে বিবেচিত হয়।
এগুলির মধ্যে অন্নদান ও খাদ্যসেবার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কোনো ক্ষুধার্ত বা প্রয়োজনমতো মানুষকে শ্রদ্ধার সঙ্গে খাবার খাওয়ানো এমন একটি মানবসেবার কাজ, যেখানে করুণা, পরোপকার ও সেবার ভাব একসঙ্গে থাকে।
পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে দানের গুরুত্ব মনুস্মৃতিতেও উল্লেখ করা হয়েছে-
যদ্যদ্দদাতি বিধিবৎসম্যক্ শ্রদ্ধাসমন্বিতঃ।
তত্তত্পিতৃণাং ভবতি পরত্রানন্তমক্ষয়ম্॥
—মনুস্মৃতি, অধ্যায় ৩, শ্লোক ২৬৫
অর্থ: শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তি বিধিপূর্বক পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে যা কিছু দান করেন, তা পরলোকে পিতৃপুরুষদের জন্য অক্ষয় হয়ে থাকে।
এই শাস্ত্রীয় ভাবনার সঙ্গে সর্ব পিতৃ অমাবস্যায় নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে দান ও সেবার সংকল্প নেওয়া উচিত।
সর্ব পিতৃ অমাবস্যার পুণ্য উপলক্ষে নারায়ণ সেবা সংস্থান -এর দরিদ্র, অসহায় এবং বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের জন্য খাদ্যসেবায় সহযোগিতা করুন। প্রয়োজনমতো মানুষের জীবনে অন্ন ও আনন্দ পৌঁছে দিয়ে আপনার পিতৃপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা নিবেদন করুন। পিতৃপুরুষদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করুন, তাঁদের উদ্দেশ্যে তর্পণ ও শ্রাদ্ধ করুন এবং দান ও খাদ্যসেবার মাধ্যমে মানবতার প্রতি নিজের কর্তব্য পালন করুন।
সর্ব পিতৃ অমাবস্যায় সেবার প্রদীপ জ্বালান, পিতৃপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করুন এবং পুণ্যের এই পবিত্র সুযোগকে মানবসেবার জন্য উৎসর্গ করুন।
প্রশ্ন: সর্ব পিতৃ অমাবস্যা ২০২৬ কবে?
উত্তর: ২০২৬ সালে সর্ব পিতৃ অমাবস্যা শনিবার, ১০ অক্টোবর পালিত হবে। এই দিনেই পিতৃ পক্ষের সমাপ্তি হবে।
প্রশ্ন: সর্ব পিতৃ অমাবস্যার গুরুত্ব কী?
উত্তর: সর্ব পিতৃ অমাবস্যা পিতৃ পক্ষের শেষ তিথি এবং সকল পরিচিত ও অজ্ঞাত পিতৃপুরুষের স্মরণ ও সম্মানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনে শ্রাদ্ধ, তর্পণ, পিণ্ডদান এবং দান-পুণ্য করার প্রথা রয়েছে।
প্রশ্ন: সর্ব পিতৃ অমাবস্যা কি শুভ?
উত্তর: সর্ব পিতৃ অমাবস্যাকে পিতৃপুরুষদের স্মরণ ও শ্রাদ্ধকর্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দিনে শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে শ্রাদ্ধ, তর্পণ, পিণ্ডদান এবং দান-পুণ্য করা হয়।
প্রশ্ন: সর্ব পিতৃ অমাবস্যায় কীভাবে শ্রাদ্ধ করবেন?
উত্তর: সকালে স্নান করে পরিষ্কার পোশাক পরুন এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে পিতৃপুরুষদের স্মরণ করুন। পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী তর্পণ, শ্রাদ্ধ অথবা পিণ্ডদান করুন। প্রয়োজনমতো মানুষকে খাবার, অন্ন, বস্ত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দান করতে পারেন।
প্রশ্ন: সর্ব পিতৃ অমাবস্যা ২০২৬-এ শ্রাদ্ধের সময় কী?
উত্তর: সর্ব পিতৃ অমাবস্যা ১০ অক্টোবর ২০২৬। প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী শ্রাদ্ধকর্ম দিনের বেলায়, বিশেষ করে অপরাহ্ণকালে করা হয়। সঠিক মুহূর্ত স্থানভেদে আলাদা হতে পারে, তাই স্থানীয় পঞ্জিকা দেখা উচিত।
প্রশ্ন: পিতৃ অমাবস্যা কী?
উত্তর: পিতৃ অমাবস্যা পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও শ্রাদ্ধকর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত অমাবস্যা তিথি। পিতৃ পক্ষের শেষ দিন সর্ব পিতৃ অমাবস্যা, যেদিন সকল পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ, তর্পণ, পিণ্ডদান এবং দান করার প্রথা রয়েছে।