19 October 2026

শরৎ পূর্ণিমা ২০২৬: তারিখ, পূজা পদ্ধতি এবং ক্ষীরের (পায়েস) গুরুত্ব

Start Chat

সনাতন ধর্মে, পূর্ণিমা তিথির এক বিশেষ পবিত্র স্থান রয়েছে। তবে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা—যা ‘শরৎ পূর্ণিমা’, ‘কোজাগরী পূর্ণিমা’ এবং ‘রাস পূর্ণিমা’ নামে পরিচিত—তার ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্বের কারণে এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। এই পবিত্র উৎসব শরৎ ঋতুর আগমনকে চিহ্নিত করে। এছাড়াও এটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ঐশ্বরিক রাসলীলা, লক্ষ্মী পূজা, চন্দ্রদেবতার উপাসনা এবং দান-ধ্যানের মতো পুণ্যকর্মের সাথে যুক্ত।

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, শরৎ পূর্ণিমার রাত অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়। এই দিনে চাঁদ তার পূর্ণ রূপ নিয়ে আলো ছড়িয়ে দেয়। শান্ত জোৎস্নায় ধ্যান করা, পূজা করা এবং ঈশ্বরের নাম জপ করার একটি প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে। এই কারণে শরৎ পূর্ণিমায় ভক্তি, আধ্যাত্মিক ভাবনা এবং পুণ্যকর্ম করার এক বিশেষ সুযোগ হিসেবে গণ্য করা হয়।

২০২৬ সালে শরৎ পূর্ণিমা কবে?

২০২৬ সালে শরৎ পূর্ণিমা পালিত হবে ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে। পূর্ণিমা তিথি ২৫ অক্টোবর সকাল ১১:৫৫ মিনিটে শুরু হবে এবং ২৬ অক্টোবর সকাল ৯:৪১ মিনিটে সমাপ্ত হবে। উদয়া তিথি এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসারে, ২৫ অক্টোবরই শরৎ পূর্ণিমা পালিত হবে।

শরৎ পূর্ণিমার ধর্মীয় গুরুত্ব

সনাতন ঐতিহ্যে শরৎ পূর্ণিমাকে ঘিরে অনেক ধর্মীয় বিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে। বিশ্বাস করা হয় যে, এই রাতে চাঁদ তার ষোলো কলা পূর্ণ করে আলো প্রদান করে। সনাতন দর্শনে চাঁদকে মনের কারক বলা হয়; তাই পূর্ণিমার শীতল জোৎস্নারাতি মনের শান্তি এবং আধ্যাত্মিক চেতনার জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

ষোলো কলার এই বিশ্বাস ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাথেও জড়িত। শ্রীকৃষ্ণকে ষোলো কলায় পূর্ণ পুরুষোত্তম অবতার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই শরৎ পূর্ণিমা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি প্রকাশ করার এবং তাঁর ঐশ্বরিক রূপকে স্মরণ করার এক পবিত্র উপলক্ষ।

শরৎ পূর্ণিমা এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা

ব্রজ অঞ্চলে শরৎ পূর্ণিমা ‘রাস পূর্ণিমা’ নামেও পরিচিত। শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণে শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলার ঐশ্বরিক বর্ণনা রয়েছে। ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসারে, শরৎ পূর্ণিমার এই পবিত্র রাতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে গোপীদের সাথে ঐশ্বরিক মহা রাসলীলা রচনা করেছিলেন।

শ্রীকৃষ্ণের বংশীর মধুর সুরে আকর্ষিত হয়ে গোপীরা তাঁর কাছে আসেন এবং এই দিব্য রাসে অংশগ্রহণ করেন। সনাতন ঐতিহ্যে এই রাসকে সাধারণ কোনো পার্থিব নৃত্য হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি জীবাত্মা এবং পরমাত্মার মধ্যকার ঐশ্বরিক প্রেম ও আত্মনিবেদনের প্রতীক।

এই কারণে ব্রজ অঞ্চলে শরৎ পূর্ণিমার রাত বিশেষ ভক্তি, ভজন, রাসলীলা পরিবেশন এবং শ্রীকৃষ্ণের পূজার মাধ্যমে উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়।

মা লক্ষ্মী পূজার গুরুত্ব

শরৎ পূর্ণিমা ‘কোজাগরী পূর্ণিমা’ নামেও সুপরিচিত। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পবিত্র রাতে দেবী লক্ষ্মীকে স্মরণ ও পূজা করলে ঘরে সুখ, সমৃদ্ধি এবং মঙ্গল লাভ হয়।

এই দিনে ভক্তরা তাঁদের ঘরদোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন, সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালান এবং ঐতিহ্যবাহী নিয়ম মেনে মা লক্ষ্মীর পূজা করেন। অনেক জায়গায় রাতে জাগ্রত থাকার (জাগরণ) নিয়মও রয়েছে। ভক্তরা সারা রাত ভক্তিগীতি গেয়ে, কীর্তন করে এবং ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে সময় কাটান।

জোৎস্নায় ক্ষীর (পায়েস) রাখার ঐতিহ্য

শরৎ পূর্ণিমার সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি ঐতিহ্য হলো রাতে খোলা আকাশের নিচে জোৎস্নায় ক্ষীর (পায়েস) রাখা। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতের চাঁদের আলোয় এক বিশেষ অমৃততুল্য গুণ থাকে।

এই প্রথার কারণে দুধ ও চাল দিয়ে তৈরি ক্ষীর খোলা আকাশের নিচে রাখা হয় এবং পরদিন তা প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ব্রজ অঞ্চলে ক্ষীরের পাশাপাশি বিশেষ মিষ্টি তৈরিরও রীতি আছে। ভক্তরা চাঁদের শীতল আলোর নিচে তা রাখেন এবং পরদিন সকালে প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করেন।

শরৎ পূর্ণিমায় দান-ধ্যানের গুরুত্ব

সনাতন ঐতিহ্যে দান করাকে একটি পরম পুণ্য কাজ বলে মনে করা হয়। দান কেবল অর্থ দেওয়া নয়; এটি ত্যাগ, করুণা এবং অপরের প্রতি সেবাভাব জাগ্রত করার একটি মাধ্যম।

ধর্মীয় শাস্ত্রে সৎ পাত্রে ভক্তিভরে দান করার গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। কূর্ম পুরাণে উল্লেখ আছে:

“স্বর্গায়ুর-ভূতি-কামেন তথা পাপোপশান্তয়ে।

মুমুক্ষুণা চ দাতব্যং ব্রাহ্মণ্যেভ্যস তথাবহম্॥”

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি স্বর্গ, দীর্ঘায়ু, সমৃদ্ধি, পাপমুক্তি বা মোক্ষ কামনা করেন, তাঁর উচিত সৎ ও উপযুক্ত পাত্রে ভক্তিভরে দান করা।

দানের ক্ষেত্রে সৎ উদ্দেশ্য এবং গ্রহীতার উপযুক্ততাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই শরৎ পূর্ণিমার মতো শুভ তিথিতে অভাবীদের সেবা করা এবং অন্নদান করা অত্যন্ত অর্থপূর্ণ সেবাকাজ।

শরৎ পূর্ণিমায় অন্নদান করুন

শরৎ পূর্ণিমার এই পবিত্র তিথিতে পূজা- প্রার্থনার পাশাপাশি অন্নদান এবং সেবামূলক কাজে অংশ নেওয়ার সংকল্প করুন। কোনো ক্ষুধার্ত ও অভাবী মানুষকে খাবার দেওয়া করুণা এবং মানবতারই রূপ।

এই শরৎ পূর্ণিমায় নারায়ণ সেবা সংস্থানের সাথে যুক্ত দরিদ্র, অসহায় এবং বিশেষভাবে সক্ষম (প্রতিবন্ধী) শিশুদের অন্নসেবায় সাহায্য করুন। আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী অন্নদানে অবদান রাখার সংকল্প নিন এবং এই শিশুদের সাথে ভালোবাসা ও আপনজন হওয়ার অনুভূতি ভাগ করে নিন।

শরৎ পূর্ণিমার পবিত্র জোৎস্নায় শ্রীহরি এবং মা লক্ষ্মীকে স্মরণ করার সাথে সাথে আপনার এই ছোট একটি সেবাকাজ আপনার উৎসবকে আরও অর্থপূর্ণ করে তুলবে।

সাধারণত জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্র. ২০২৬ সালে শরৎ পূর্ণিমা কবে?

উ. শরৎ পূর্ণিমা ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে পালিত হবে।

প্র. শরৎ পূর্ণিমার রাতে ক্ষীর কেন বাইরে রাখা হয়?

উ. শরৎ পূর্ণিমার রাতে চাঁদের শীতল আলোর নিচে ক্ষীর রাখার ঐতিহ্য রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে চাঁদের আলোয় বিশেষ ঔষধি ও অমৃত গুণ থাকে এবং সেই ক্ষীর পরদিন প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

প্র. শরৎ পূর্ণিমায় কার পূজা করা হয়?

উ. শরৎ পূর্ণিমায় ঐতিহ্যগতভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়।

X
Amount = INR