সনাতন ধর্মে একাদশীকে ভগবান শ্রীহরির চরণে মন, বাক্য ও কর্ম সমর্পণের এক পবিত্র উপলক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সারা বছর পালিত প্রতিটি একাদশীরই নিজস্ব বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। এর মধ্যে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিকে পাপাঙ্কুশা একাদশী বলা হয়।
‘পাপাঙ্কুশা’ শব্দটি দুটি ভাবের সঙ্গে যুক্ত। ‘পাপ’ অর্থ অধার্মিক কর্ম এবং ‘অঙ্কুশ’ অর্থ নিয়ন্ত্রণ করার উপায়। ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসারে, এই একাদশী মানুষকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত হয়ে ভগবান বিষ্ণুর ভক্তি, সংযম ও সদাচারের পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। পাপাঙ্কুশা একাদশীতে ভগবান বিষ্ণুর আরাধনা, উপবাস, নামস্মরণ, ধর্মীয় কাহিনি শ্রবণ, রাত্রিজাগরণ এবং দান-পুণ্য করার প্রথা রয়েছে। এই দিনটি নিজের অন্তরে ভক্তি ও সাত্ত্বিকতার প্রদীপ জ্বালানোর এক পবিত্র সুযোগ।
২০২৬ সালে পাপাঙ্কুশা একাদশীর উপবাস বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর পালন করা হবে। দিল্লির সময় অনুযায়ী, একাদশী তিথি ২১ অক্টোবর দুপুর ২টা ১১ মিনিটে শুরু হয়ে ২২ অক্টোবর দুপুর ২টা ৪৭ মিনিটে শেষ হবে। উদয়তিথি অনুসারে ২২ অক্টোবর উপবাস পালন করা হবে।
উপবাস ও পারণের সঠিক সময় জানার জন্য নিজের শহরের স্থানীয় পঞ্জিকা দেখে নেওয়া উচিত। কারণ স্থানভেদে সময়ের কিছুটা পার্থক্য হতে পারে।
পাপাঙ্কুশা একাদশী ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আরাধনা এবং আত্মসংযমের সাধনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পবিত্র দিন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই দিনে ভক্তরা জাগতিক বিষয় থেকে মন সরিয়ে ভগবান শ্রীহরির নামস্মরণে নিমগ্ন হন। পৌরাণিক ঐতিহ্য অনুসারে, এই একাদশীর মাহাত্ম্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে দেওয়া উপদেশের সঙ্গে যুক্ত। পদ্মপুরাণের একাদশী মাহাত্ম্যে এই তিথিতে উপবাস, ভগবানের আরাধনা, দান এবং রাত্রিজাগরণের গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে।
এই দিনে ভক্তরা ভগবান বিষ্ণুর পদ্মনাভ স্বরূপ স্মরণ করে নিজেদের জীবনে সত্য, সংযম ও সদাচার গ্রহণের সংকল্প করেন। একাদশীর প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু খাবার ত্যাগ করা নয়, বরং মনকেও বিষয়-আসক্তি ও নেতিবাচক প্রবৃত্তি থেকে দূরে রেখে ভগবানের ভক্তিতে নিয়োজিত করা।
পাপাঙ্কুশা একাদশীতে দান ও সেবার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সনাতন ঐতিহ্যে দানকে শুধু অর্থ বা বস্তু দেওয়ার কাজ হিসেবে দেখা হয় না; এর সঙ্গে ত্যাগ, করুণা ও জনকল্যাণের ভাবনা যুক্ত রয়েছে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সাত্ত্বিক দানের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন।
দাতব্যমিতি যদ্দানং দীয়তেঽনুপকারিণে।
দেশে কালে চ পাত্রে চ তদ্দানং সাত্ত্বিকং স্মৃতম্॥
অর্থ: কর্তব্য মনে করে উপযুক্ত সময়ে, উপযুক্ত স্থানে এবং যোগ্য ব্যক্তিকে কোনো প্রতিদানের আশা না রেখে যে দান করা হয়, তাকে সাত্ত্বিক দান বলা হয়।
ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার খাওয়ানো ভারতীয় সনাতন ঐতিহ্যে করুণা ও সেবার একটি মহৎ রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়। যখন কোনো অভাবী মানুষের কাছে খাবারের থালা পৌঁছে যায়, তখন তা শুধু অন্ন থাকে না; এর সঙ্গে ভালোবাসা, সম্মান এবং মানবিকতার অনুভূতিও জড়িয়ে থাকে। এই ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে পাপাঙ্কুশা একাদশীর পবিত্র উপলক্ষে অসহায় ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের খাদ্যসেবায় অংশ নেওয়া ভক্তিকে সেবার সঙ্গে যুক্ত করার এক সুন্দর সুযোগ।
নারায়ণ সেবা সংস্থান দরিদ্র, অসহায়, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, অনাথ এবং প্রয়োজনগ্রস্ত শিশুদের জন্য খাদ্যসেবা প্রকল্প পরিচালনা করে। এই সেবায় সহযোগিতা করে কোনো অভাবী শিশুর মুখে খাবার তুলে দিতে সাহায্য করুন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যজ্ঞ, দান ও তপস্যাকে মানুষের জন্য পবিত্র কর্ম হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
যজ্ঞদানতপঃকর্ম ন ত্যাজ্যং কার্য্যমেব তৎ।
যজ্ঞো দানং তপশ্চৈব পাবনানি মনীষিণাম্॥
অর্থ: যজ্ঞ, দান ও তপস্যার মতো কর্ম ত্যাগ করা উচিত নয়। এই কর্মগুলির অনুশীলন মানুষকে পবিত্র করে বলে মনে করা হয়।
পাপাঙ্কুশা একাদশী আমাদের নিজেদের অন্তরের কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে, ভগবান শ্রীহরির ভক্তিতে মনোনিবেশ করতে এবং জীবনে সাত্ত্বিক কর্মকে গুরুত্ব দিতে অনুপ্রাণিত করে। মন্দিরে প্রদীপ জ্বালানোর মাধ্যমে ভগবানের আরাধনা শুরু হয়, কিন্তু সেই ভক্তি যখন কোনো অভাবী মানুষের জীবনে আশ্রয় হয়ে ওঠে, তখন তার আলো আরও ছড়িয়ে পড়ে।
এই পবিত্র একাদশীতে ভগবান বিষ্ণুর চরণে ভক্তি নিবেদন করুন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দান করুন, ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ান এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের খাদ্যসেবায় অংশ নিন। আপনার সামান্য সহযোগিতাও কোনো শিশুর জীবনে ভালোবাসা, যত্ন ও সম্মানের অনুভূতি এনে দিতে পারে।
আসুন, এই পাপাঙ্কুশা একাদশীতে ভক্তির সঙ্গে সেবা, উপবাসের সঙ্গে সংযম এবং পূজার সঙ্গে করুণার সংকল্প গ্রহণ করি।
ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়।
প্রশ্ন: ২০২৬ সালে পাপাঙ্কুশা একাদশী কবে?
উত্তর: ২০২৬ সালে পাপাঙ্কুশা একাদশী বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর পালিত হবে।
প্রশ্ন: পাপাঙ্কুশা একাদশীতে কোন দেবতার পূজা করা হয়?
উত্তর: এই দিনে ভগবান বিষ্ণুর পদ্মনাভ স্বরূপের পূজা করার বিধান রয়েছে।
প্রশ্ন: পাপাঙ্কুশা একাদশীর উপবাস কীভাবে পালন করা হয়?
উত্তর: ভক্তরা নিজেদের বিশ্বাস ও শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী নির্জলা উপবাস অথবা ফলাহার করে উপবাস পালন করতে পারেন।
প্রশ্ন: পাপাঙ্কুশা একাদশীর উপবাস কখন ভাঙতে হয়?
উত্তর: সাধারণত একাদশীর উপবাস পরের দিন দ্বাদশী তিথিতে সূর্যোদয়ের পর পারণ করে সম্পন্ন করা হয়। সঠিক সময় জানতে স্থানীয় পঞ্জিকা দেখে নেওয়া উচিত।