28 October 2026

রমা একাদশী ২০২৬: তিথি, শুভ মুহূর্ত, পূজার পদ্ধতি, ব্রতকথা ও দানের গুরুত্ব

Start Chat

সনাতন ধর্মে একাদশী তিথিকে ভগবান বিষ্ণুর আরাধনার জন্য অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়। প্রতি মাসে দুবার আসা একাদশী ভক্তদের সংযম, ভক্তি, উপবাস ও ঈশ্বরস্মরণের মাধ্যমে নিজেদের অন্তরকে শুদ্ধ করার সুযোগ দেয়। সারা বছরে পালিত প্রতিটি একাদশীরই নিজস্ব বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তবে কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, যা রমা একাদশী নামে পরিচিত।

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রমা একাদশী পাপ নাশ করে পুণ্য প্রদানকারী একটি পবিত্র তিথি। এই দিনে ভগবান বিষ্ণুর পূজা, হরিনাম স্মরণ, উপবাস, দান এবং সেবার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। দেবী লক্ষ্মীর নামগুলির মধ্যে ‘রমা’ একটি উল্লেখযোগ্য নাম হওয়ায় রমা একাদশীর সঙ্গে দেবী লক্ষ্মীরও সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়।

রমা একাদশী ২০২৬ কবে?

২০২৬ সালে রমা একাদশী ৫ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার পালিত হবে। পঞ্জিকা অনুযায়ী, একাদশী তিথি ৪ নভেম্বর সকাল ১১টা ০৩ মিনিটে শুরু হবে এবং ৫ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে শেষ হবে। উদয় তিথি অনুসারে ৫ নভেম্বর উপবাস পালন করা হবে।

ব্রত পারণের সময় স্থানভেদে আলাদা হতে পারে। তাই দ্বাদশী তিথিতে উপবাস ভঙ্গের সঠিক সময় জানতে নিজের স্থানীয় পঞ্জিকা দেখে নিন।

রমা একাদশীর ধর্মীয় গুরুত্ব

রমা একাদশী ভগবান বিষ্ণুর প্রতি ভক্তি ও সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের একটি পবিত্র উপলক্ষ। এই দিনে ভক্তরা ভোরে স্নান করে ব্রত পালনের সংকল্প নেন এবং ভগবান বিষ্ণু ও দেবী লক্ষ্মীর পূজা করেন। শ্রীহরির নামজপ, বিষ্ণু সহস্রনাম পাঠ, ঈশ্বরস্মরণ এবং সৎকর্ম এই দিনের আধ্যাত্মিক সাধনাকে আরও পবিত্র করে তোলে।

রমা একাদশীর সঙ্গে সম্পর্কিত ব্রতকথা পদ্মপুরাণে বর্ণিত হয়েছে। এই কাহিনিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে রমা একাদশীর মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করেছেন।

রমা একাদশীর ব্রতকথা

প্রাচীনকালে মুচুকুন্দ নামে এক ধর্মপরায়ণ রাজা ছিলেন। তিনি ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত ছিলেন। তাঁর কন্যা চন্দ্রভাগার সঙ্গে শোভন নামে এক যুবকের বিবাহ হয়েছিল। একবার শোভন তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতে আসেন। সেই সময় কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের পবিত্র রমা একাদশী উপস্থিত হয়।

রাজার রাজ্যে একাদশীর দিন উপবাস পালনের প্রথা ছিল। কাহিনি অনুসারে, শুধু প্রজারাই নয়, রাজ্যের পশুপাখিদেরও সেই দিন খাবার দেওয়া হতো না। শোভন শারীরিকভাবে দুর্বল ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা তাঁর পক্ষে কঠিন ছিল। তবুও তিনি একাদশীর ব্রত পালনের সংকল্প করেন।

ব্রতের প্রভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। চন্দ্রভাগা স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পিতার আদেশ এবং ভগবান বিষ্ণুর প্রতি তাঁর অটুট বিশ্বাসের কারণে তিনি নিজের জীবন ভক্তি ও একাদশীর ব্রতসাধনায় উৎসর্গ করেন।

রমা একাদশীর ব্রতের প্রভাবে শোভন দিব্যলোকে একটি সুন্দর নগরী ও রাজ্য লাভ করেন। একবার মুচুকুন্দের রাজ্যের সোমশর্মা নামে এক ব্রাহ্মণ তীর্থযাত্রা করতে করতে সেই দিব্য রাজ্যে পৌঁছান এবং শোভনকে চিনতে পারেন।

শোভন তাঁকে জানান যে রমা একাদশীর ব্রতের ফলেই তিনি এই দিব্য রাজ্য লাভ করেছেন। তবে সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের অভাবে পালিত ব্রতের কারণে তাঁর রাজ্য স্থায়ী নয়।

সোমশর্মা ফিরে এসে চন্দ্রভাগাকে এই কথা জানান। চন্দ্রভাগা বহু বছর ধরে নিষ্ঠা ও ভক্তির সঙ্গে পালন করা একাদশী ব্রতের পুণ্যফল তাঁর স্বামীকে উৎসর্গ করেন। কাহিনি অনুসারে, এর ফলে শোভনের রাজ্য স্থায়ী হয় এবং তাঁরা দুজন সুখে জীবনযাপন করতে থাকেন।

রমা একাদশীর পূজার পদ্ধতি

  • রমা একাদশীর দিন ব্রহ্মমুহূর্তে ঘুম থেকে উঠে স্নান করুন এবং পরিষ্কার পোশাক পরুন। এরপর ভগবান বিষ্ণুর সামনে ব্রত পালনের সংকল্প নিন। পূজার স্থান পরিষ্কার করে ভগবান বিষ্ণু ও দেবী লক্ষ্মীর মূর্তি বা ছবি স্থাপন করুন।
  • শ্রীহরিকে হলুদ ফুল, তুলসী পাতা, চন্দন, অক্ষত এবং নৈবেদ্য অর্পণ করুন। ভক্তিভরে পূজা করুন এবং ভগবান বিষ্ণুকে স্মরণ করে ‘ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়’ মন্ত্র জপ করুন। নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী বিষ্ণু সহস্রনাম, ভগবদ্গীতা অথবা একাদশীর ব্রতকথা পাঠ করুন বা শুনুন। শেষে আরতি করে ভগবানের কাছে প্রণাম জানান এবং তাঁর আশীর্বাদ প্রার্থনা করুন।
  • নিজের শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে একাদশীর উপবাস পালন করুন। ধর্মীয় প্রথায় শুধু জল পান করে উপবাস, ফলাহারসহ বিভিন্ন ধরনের উপবাসের উল্লেখ রয়েছে।
  • সারাদিন সাত্ত্বিক চিন্তাভাবনা বজায় রাখুন। রাগ, বিবাদ ও নেতিবাচক চিন্তা থেকে দূরে থাকুন এবং যতটা সম্ভব ঈশ্বরের নামস্মরণ ও ভক্তিতে সময় কাটান। দ্বাদশী তিথিতে স্থানীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী উপযুক্ত সময়ে উপবাস ভঙ্গ করুন।

রমা একাদশীতে দান ও সেবার গুরুত্ব

সনাতন সংস্কৃতিতে দানকে করুণা ও পরোপকারের প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একাদশীর এই পবিত্র দিন আমাদের ভক্তির পাশাপাশি সেবা ও সৎকর্মে অংশগ্রহণের প্রেরণা দেয়। ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো, অভাবী মানুষকে সাহায্য করা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানবতার প্রকৃত সেবা। ভক্তির সঙ্গে সেবা যুক্ত হলে উপাসনার মহত্ত্ব আরও বৃদ্ধি পায়।

দরিদ্র ও বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের খাবার খাওয়ান

এই পবিত্র রমা একাদশীতে নারায়ণ সেবা সংস্থানের অসহায়, দরিদ্র ও বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের খাদ্যসেবা প্রকল্পে সহযোগিতা করে পুণ্যের অংশীদার হন। অভাবী শিশুদের থালায় পুষ্টিকর ও সুস্বাদু খাবার পৌঁছে দিতে সাহায্য করুন। খাদ্যসেবার মাধ্যমে তাদের মুখে হাসি ফোটানোর পবিত্র সংকল্প নিন।

রমা একাদশীতে শ্রীহরিকে স্মরণ করুন, দেবী লক্ষ্মীর ধ্যান করুন, হরিনাম জপ করুন এবং সেবার সংকল্প নিন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অভাবী মানুষকে সাহায্য করুন। ভক্তির সঙ্গে পরোপকারকে যুক্ত করে এই পবিত্র দিনটিকে সার্থক করে তুলুন।

 

 

 

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: রমা একাদশী ২০২৬ কবে পালিত হবে?

উত্তর: ২০২৬ সালে রমা একাদশী ৫ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার পালিত হবে।

প্রশ্ন: রমা একাদশীর গুরুত্ব কী?

উত্তর: রমা একাদশী ভগবান বিষ্ণু ও দেবী লক্ষ্মীর উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত একটি পবিত্র তিথি। এই দিনে উপবাস, ভগবান বিষ্ণুর পূজা, হরিনাম স্মরণ, দান এবং সেবার বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে।

প্রশ্ন: রমা একাদশীর ব্রত কেন পালন করা হয়?

উত্তর: ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, নিষ্ঠা ও ভক্তির সঙ্গে রমা একাদশীর ব্রত পালন করলে ভগবান বিষ্ণু ও দেবী লক্ষ্মীর আশীর্বাদ লাভ করা যায়।

প্রশ্ন: রমা একাদশীতে ভগবান বিষ্ণুর সঙ্গে কার পূজা করা হয়?

উত্তর: রমা একাদশীতে ভগবান বিষ্ণুর পাশাপাশি দেবী লক্ষ্মীর পূজা করার প্রথা রয়েছে।

প্রশ্ন: রমা একাদশীর পূজায় ভগবান বিষ্ণুকে কী কী অর্পণ করা হয়?

উত্তর: পূজায় ভগবান বিষ্ণুকে তুলসী পাতা, হলুদ ফুল, চন্দন, অক্ষত এবং নৈবেদ্য ভক্তিভরে অর্পণ করা হয়।

X
Amount = INR