কার্তিক মাসের অমাবস্যার রাত, যখন ঘর-আঙিনায় প্রদীপের সারি সাজানো হয় এবং পরিবেশ ভক্তি ও উল্লাসে ভরে ওঠে, তখন দীপাবলি নামক পবিত্র উৎসব জীবনে নতুন আশা ও মঙ্গলের বার্তা নিয়ে আসে। এটি নিজের অন্তর্মনকে আলোকিত করার, সৎকর্মের পথে এগিয়ে যাওয়ার এবং জীবনে ধর্ম, করুণা ও সদ্ভাবকে স্থান দেওয়ার উৎসব।
সনাতন পরম্পরায় দীপাবলিকে সুখ-সমৃদ্ধি, শুভতা ও আধ্যাত্মিক জাগরণের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। এই দিনে ভক্তরা মাতা লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের আরাধনা করেন এবং পরিবারের সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির কামনা করেন। সঙ্গে সঙ্গে অভাবীদের জীবনে আনন্দ আনতে এবং সেবার মাধ্যমে উৎসবের সার্থকতা বাড়ানোর সংকল্পও নেন।
হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে কার্তিক মাসের অমাবস্যায় দীপাবলি পালিত হয়। এই তিথিতে প্রদোষকালে প্রদীপদান ও মাতা লক্ষ্মীর পূজার বিধান রয়েছে। দ্রিক পঞ্জিকায় প্রাপ্ত গণনা অনুসারে, দীপাবলি ৮ নভেম্বর ২০২৬, রবিবার পালিত হবে। অমাবস্যা তিথি ৮ নভেম্বর সকাল ১১:২৭-এ শুরু হয়ে ৯ নভেম্বর দুপুর ১২:৩১ পর্যন্ত থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীপাবলির সন্ধ্যা মাতা মহালক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের আরাধনার জন্য বিশেষ বলে বিবেচিত। মাতা লক্ষ্মী ধন, ঐশ্বর্য, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী দেবী; ভগবান গণেশ বিঘ্ননাশক এবং শুভ কাজের শুরুতে পূজনীয়। তাই দীপাবলিতে উভয়ের যৌথ পূজার পরম্পরা রয়েছে।
পঞ্জিকা অনুসারে, ৮ নভেম্বর ২০২৬-এ লক্ষ্মী পূজার শুভ সময় সন্ধ্যা ৫:৫৪ থেকে ৭:৫০ পর্যন্ত। এই সময়ে শ্রদ্ধালুরা বিধিমতো পূজা-অর্চনা করে পরিবারের সুখ, শান্তি ও মঙ্গল কামনা করুন।
পূজার সময় ঘরের পরিবেশ শান্ত ও পবিত্র রাখুন। পূজার সময় শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও নির্মল মন বজায় রাখুন। নিজের পারিবারিক পরম্পরা ও স্থানীয় পঞ্জিকা অনুসারে পূজার সময় ও পদ্ধতি নির্ধারণ করুন।
দীপাবলির প্রকৃত বার্তা হলো নিজের অন্তর্মনকে সদ্গুণে আলোকিত করা। ঘরগুলোতে জ্বলতে থাকা প্রদীপের ছোট্ট শিখা মনে করিয়ে দেয় যে অন্ধকার যতই গভীর হোক না কেন, আলোর একটি রশ্মি তাকে দূর করার সামর্থ্য রাখে। একইভাবে জীবনে সত্য, বিবেক ও সদাচার অনুসরণ করে অজ্ঞান, ঈর্ষা, ক্রোধ ও অহংকারের মতো দোষগুলোর ওপর জয়লাভ করা যায়।
সনাতনের দিব্য পরম্পরায় দীপাবলিকে ধর্ম, শুভতা ও নতুন শুরুর প্রতীক বলে মনে করা হয়। এই উৎসবে মানুষ ঘর পরিষ্কার করে, মন্দির সাজায়, প্রদীপ জ্বালায় এবং আরাধ্য দেবী-দেবতাদের স্মরণ করে। এটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়া, পুরনো মতবিরোধ দূর করা এবং সম্পর্কে মাধুর্য আনার প্রেরণাও দেয়।
দীপাবলির সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে বিখ্যাত বিশ্বাসগুলোর মধ্যে ভগবান শ্রীরামের অযোধ্যায় ফিরে আসার প্রসঙ্গ প্রধান। বিশ্বাস করা হয় যে চোদ্দ বছরের বনবাস শেষ করে এবং রাবণকে পরাজিত করার পর ভগবান শ্রীরাম মাতা সীতা ও লক্ষ্মণের সঙ্গে অযোধ্যায় ফিরেছিলেন। তাঁদের আগমনের আনন্দে অযোধ্যার বাসিন্দারা প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁদের স্বাগত জানিয়েছিলেন।
দীপাবলির পরম্পরা ভারতীয় সংস্কৃতিতে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। প্রাচীন সাহিত্য, ধর্মীয় গ্রন্থ ও ঐতিহাসিক রচনায় দীপোৎসব ও দীপমালিকার মতো উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায়। পদ্ম পুরাণ ও স্কন্দ পুরাণেও দীপাবলির সঙ্গে যুক্ত পরম্পরা ও প্রদীপের গুরুত্বের বর্ণনা রয়েছে।
প্রদীপ ভারতীয় সংস্কৃতিতে জ্ঞান, পবিত্রতা ও মঙ্গলের প্রতীক। প্রদীপ জ্বালানোর সময় মানুষ জীবনে বিবেক ও সদ্বুদ্ধির আলো কামনা করে। এ কারণেই পূজা-পাঠ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও মাঙ্গলিক উপলক্ষে প্রদীপ জ্বালানোর পরম্পরা আজও প্রচলিত।
দীপাবলি উৎসব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন লোকপরম্পরা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে পালিত হয়। কোথাও একে ভগবান শ্রীরামের অযোধ্যায় ফিরে আসার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, কোথাও মাতা লক্ষ্মীর আরাধনা, বাণিজ্যিক নববর্ষ ও অন্যান্য স্থানীয় ধর্মীয় পরম্পরাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও দীপাবলির মূল ভাব হলো আলো, মঙ্গল ও সদ্ভাব।
দীপাবলির সঙ্গে আরও কয়েকটি উৎসব যুক্ত। এগুলো দীপাবলির সঙ্গেই পালিত হয় বলে এগুলোকে দীপাবলির অংশ বলেই ধরা হয়। এই উৎসবগুলো পাঁচ থেকে ছয় দিন পর্যন্ত চলে।
দীপাবলির দিন সকালে উঠে স্নান করুন এবং ঘর ও পূজার স্থান পরিষ্কার রাখুন। সন্ধ্যায় একটি চৌকিতে লাল বা হলুদ কাপড় বিছিয়ে মাতা লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের মূর্তি স্থাপন করুন। মূর্তির দিক ও স্থাপন নিজের পারিবারিক পরম্পরা বা পুরোহিতের নির্দেশ অনুসারে রাখুন।
এরপর প্রদীপ জ্বালিয়ে ভগবানের ধ্যান করুন এবং পূজার সংকল্প নিন। পূজায় পুষ্প, অক্ষত, চন্দন, ধূপ, প্রদীপ, ফল, ক্ষীর, বাতাসা, লাই ও মিষ্টি নিবেদন করুন। মাতা লক্ষ্মীকে শ্রদ্ধার সঙ্গে পুষ্প ও নৈবেদ্য সমর্পণ করুন এবং ভগবান গণেশকে দূর্বা ও প্রিয় ভোগ নিবেদন করুন।
এরপর লক্ষ্মী-গণেশ মন্ত্রের জপ করুন। লক্ষ্মী চালিশা, শ্রীসূক্তম বা পরিবারে প্রচলিত স্তুতি পাঠ করে আরতি করুন। পূজা শেষে প্রসাদ বিতরণ করুন এবং ঘরের দরজা, আঙিনা ও পূজার স্থানে প্রদীপ জ্বালান।
মনে রাখবেন, পূজার পদ্ধতি পরিবার ও আঞ্চলিক পরম্পরা অনুসারে ভিন্ন হতে পারে। তাই নিজের পরম্পরা অনুসারে শ্রদ্ধার সঙ্গে পূজা করাই যথাযথ।
দীপাবলির উপলক্ষে প্রার্থনা ও মন্ত্র স্মরণ মনকে একাগ্র করতে এবং জীবনে ইতিবাচক দৃষ্টি গড়ে তুলতে সাহায্য করে। বৃহদারণ্যক উপনিষদের এই বিখ্যাত মন্ত্র আলো ও আত্মজ্ঞানের ভাবনাকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করে।
অসতো মা সদ্গময়।
তমসো মা জ্যোতির্গময়।
মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ॥
ভাবার্থ: হে প্রভু! আমাদের অসত্য থেকে সত্যের দিকে, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এবং মৃত্যু থেকে অমৃতত্বের দিকে নিয়ে চলুন।
এই প্রার্থনা দীপাবলির আধ্যাত্মিক বার্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এটি বাইরের আলোর সঙ্গে সঙ্গে নিজের চিন্তা ও কর্মেও জ্ঞান, সত্য ও সদাচারের আলো আনার প্রেরণা দেয়।
দীপাবলির আনন্দ তখনই আরও সার্থক হয়, যখন আমাদের সুখের মধ্যে অভাবীদেরও স্থান থাকে। সনাতন পরম্পরায় দান, করুণা ও পরোপকারকে গুরুত্বপূর্ণ সদ্গুণ বলে মনে করা হয়। উৎসবের সময় কোনো অভাবী পরিবারকে খাবার দেওয়া, উৎসবের সামগ্রী উপহার দেওয়া, অসহায় ব্যক্তিকে সাহায্য করা বা কোনো বঞ্চিত শিশুর মুখে হাসি ফোটানোও সেবার পুণ্যময় মাধ্যম।
এই ভাবনা নিয়ে এই দীপাবলিতে নারায়ণ সেবা সংস্থান ‘প্রতি ঘরে খুশির দীপাবলি’ সেবা প্রকল্প পরিচালনা করছে; যার অধীনে অভাবী মানুষদের ‘গিফট বক্স’ বিতরণ করা হচ্ছে। প্রতিটি বক্সে পূজার সামগ্রী, আতশবাজি, বস্ত্র ও মিষ্টি থাকবে। অনুগ্রহ করে আপনার সহযোগিতায় দীন-হীন, অসহায় ও অভাবীদের দীপাবলি আলোকিত করুন। আপনার সেবাভাব কোনো পরিবারের জন্য উৎসবের কারণ হতে পারে এবং কোনো অভাবীর জীবনে আশার নতুন আলো জ্বালাতে পারে।
দীপাবলি হৃদয়ে ভক্তি, চিন্তায় পবিত্রতা ও কর্মে পরোপকারের আলো জ্বালানোর সুযোগ। মাতা লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের আরাধনা করতে গিয়ে আমরা সংকল্প করি যে জীবনে সত্য, সদাচার, বিনম্রতা ও করুণাকে স্থান দেব। এই দীপাবলিতে পরিবারের সঙ্গে ভালোবাসা ভাগ করুন, প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ব পালন করুন, অভাবীদের সাহায্য করুন এবং উৎসব আনন্দময়ভাবে পালন করুন। প্রদীপের শিখা প্রতিদিন মনে করিয়ে দিক যে প্রকৃত আলো সেই, যা আমাদের ভিতরের অজ্ঞান দূর করে এবং অন্যের জীবনেও আশা জাগায়।
মাতা মহালক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের কৃপায় সবার জীবনে সুখ, শান্তি, সদ্বুদ্ধি ও মঙ্গল বাস করুক। প্রতিটি ঘরে ভালোবাসার প্রদীপ জ্বলুক এবং প্রতিটি হৃদয় সেবা ও সদ্ভাবে আলোকিত হোক।
আপনাদের সবাইকে দীপাবলি ২০২৬-এর হার্দিক শুভেচ্ছা।
প্রশ্ন: দীপাবলি ২০২৬ কবে পালিত হবে?
উত্তর: দীপাবলি উৎসব ৮ নভেম্বর ২০২৬-এ পালিত হবে।
প্রশ্ন: দীপাবলি ২০২৬-এ লক্ষ্মী-গণেশ পূজার শুভ মুহূর্ত কী?
উত্তর: পঞ্জিকা অনুসারে, ৮ নভেম্বর ২০২৬-এ লক্ষ্মী পূজার শুভ মুহূর্ত সন্ধ্যা ৫:৫৪ থেকে ৭:৫০ পর্যন্ত।
প্রশ্ন: দীপাবলিতে প্রদীপ কেন জ্বালানো হয়?
উত্তর: প্রদীপ জ্বালানো আলো, জ্ঞান, শুভতা ও আশার প্রতীক। সঙ্গে সঙ্গে এটি ভগবান রামের অযোধ্যায় ফিরে আসার স্মরণে পালিত হয়।
প্রশ্ন: নারায়ণ সেবা সংস্থানের ‘প্রতি ঘরে খুশির দীপাবলি’ সেবা প্রকল্পে কীভাবে যোগ দেওয়া যায়?
উত্তর: ‘প্রতি ঘরে খুশির দীপাবলি’ সেবা প্রকল্পে সহযোগিতা করতে নারায়ণ সেবা সংস্থানের ওয়েবসাইটে সহযোগিতা করা যায়।