দীপাবলি উৎসবের পর পালিত গোবর্ধন পূজা হিন্দুধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, গোবর্ধন পর্বত এবং গোমাতার পূজা করা হয়। এই উৎসব প্রকৃতি, পরিবেশ এবং গোরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে। গোবর্ধন পূজাকে অন্নকূট উৎসবও বলা হয়। এই দিনে ভগবানের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের খাবার নিবেদন করা হয়।
আসুন, গোবর্ধন পূজা ২০২৬-এর তারিখ, শুভ মুহূর্ত, পূজার বিধি এবং এই উৎসবের ধর্মীয় গুরুত্ব সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
২০২৬ সালে গোবর্ধন পূজার পবিত্র উৎসবটি ১০ নভেম্বর, মঙ্গলবার উদযাপিত হবে। ‘দৃক পঞ্জিকা’ (Drik Panchang) অনুযায়ী, কার্তিক শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথি ৯ নভেম্বর, ২০২৬ তারিখে দুপুর ১২:৩১ মিনিটে শুরু হবে এবং ১০ নভেম্বর, ২০২৬ তারিখে দুপুর ২:০০ টায় শেষ হবে। সনাতন ধর্মে উৎসবের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘উদয়া তিথি’—অর্থাৎ সূর্যোদয়ের সময় যে তিথি বিদ্যমান থাকে—তার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই রীতি অনুসরণ করেই এ বছর ১০ নভেম্বর গোবর্ধন পূজা উদযাপিত হবে।
গোবর্ধন পূজার জন্য সকালের শুভ মুহূর্তটি হলো সকাল ৬:৪০ মিনিট থেকে সকাল ৮:৫০ মিনিট পর্যন্ত। এই পবিত্র সময়ে ভক্তরা যথাযথ আচার-অনুষ্ঠান ও ভক্তি সহকারে গোবর্ধন মহারাজের পূজা করতে পারবেন।
গোবর্ধন পূজা হলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলা এবং প্রকৃতির গুরুত্ব স্মরণ করার একটি পবিত্র উৎসব। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, ব্রজবাসীরা বৃষ্টি ও সমৃদ্ধির জন্য ইন্দ্রদেবের পূজা করতেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের ইন্দ্রের পরিবর্তে গোবর্ধন পর্বতের পূজা করার পরামর্শ দেন। কারণ, গোবর্ধন পর্বত তাঁদের খাদ্য, পশুখাদ্য এবং জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সম্পদ সরবরাহ করত।
শ্রীকৃষ্ণের এই পরামর্শে ক্রুদ্ধ হয়ে ইন্দ্রদেব ব্রজভূমিতে প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটান। তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর কনিষ্ঠ আঙুলের ওপর গোবর্ধন পর্বত তুলে ধরে সাত দিন ধরে ব্রজবাসীদের আশ্রয় দেন। অবশেষে ইন্দ্র নিজের ভুল বুঝতে পেরে শ্রীকৃষ্ণের কাছে নতিস্বীকার করেন।
এই ঘটনা প্রকৃতির গুরুত্ব, ভক্তি, বিনয় এবং অহংকার ত্যাগের বার্তা দেয়। এই কারণেই গোবর্ধন পূজার দিন গোবর্ধন পর্বত ও গোমাতার ভক্তিভরে পূজা করা হয়।
গোবর্ধন পূজার দিন অন্নকূট নামে একটি বিশেষ আচারও পালন করা হয়। এই দিনে ভক্তরা বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেন। বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্যের সমষ্টিকে অন্নকূট বলা হয়।
মন্দিরে এবং বাড়িতে অন্নকূটের আয়োজন করে ভগবানের উদ্দেশ্যে নানা পদ নিবেদন করা হয়। পরে সেই প্রসাদ ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এই প্রথা অন্নের গুরুত্ব, কৃতজ্ঞতা এবং একসঙ্গে ভাগ করে খাওয়ার সংস্কৃতির বার্তা দেয়।
গোবর্ধন পূজার দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে পরিষ্কার পোশাক পরুন। এরপর পূজার স্থান পরিষ্কার করে সেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি বা ছবি স্থাপন করুন। এই দিনে নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে পূজা করতে পারেন:
গোবর্ধন পূজার সময় গোবর্ধন পরিক্রমার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। উত্তরপ্রদেশের মথুরা জেলায় অবস্থিত গোবর্ধন পর্বতকে ঘিরে ভক্তরা পরিক্রমা করেন। এই পরিক্রমার দৈর্ঘ্য প্রায় ২১ কিলোমিটার।
ভক্তরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নাম জপ করতে করতে ভক্তিভরে এই পরিক্রমা সম্পন্ন করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, গোবর্ধন পরিক্রমা করলে ভগবানের আশীর্বাদ লাভ হয় এবং জীবনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে।
গোবর্ধন পূজা এমন একটি উৎসব, যা প্রকৃতি, প্রাণী এবং মানবজীবনের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই পবিত্র দিনে পূজা ও প্রার্থনার পাশাপাশি অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সংকল্পও নিতে পারেন। ক্ষুধার্তদের অন্নদান, অসহায়দের সাহায্য এবং বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের কল্যাণে অনুদান দেওয়া মানবিকতার সুন্দর প্রকাশ।
নারায়ণ সেবা সংস্থান বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের বিনামূল্যে সংশোধনমূলক অস্ত্রোপচার, কৃত্রিম অঙ্গ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা প্রদান করে তাঁদের জীবনে নতুন আশার আলো জাগিয়ে তুলছে। এই গোবর্ধন পূজায় সেবা ও দানের মাধ্যমে অন্যের জীবনে আনন্দ ছড়িয়ে দিন।
প্র. গোবর্ধন পূজা ২০২৬ কবে পালিত হবে?
উ. ২০২৬ সালের ১০ নভেম্বর, মঙ্গলবার গোবর্ধন পূজা পালিত হবে।
প্র. কেন গোবর্ধন পূজা পালন করা হয়?
উ. ইন্দ্রের ক্রোধ থেকে ব্রজবাসীদের রক্ষা করার জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর কনিষ্ঠ আঙুলের ওপর গোবর্ধন পর্বত তুলে ধরেছিলেন। সেই ঘটনার স্মরণে এই উৎসব পালন করা হয়। এটি প্রকৃতি ও পরিবেশের গুরুত্বও তুলে ধরে।
প্র. কীভাবে গোবর্ধন পূজা করা হয়?
উ. এই দিনে গোবর দিয়ে গোবর্ধন পর্বতের আকৃতি তৈরি করে ফুল দিয়ে সাজানো হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূজা করে অন্নকূট নিবেদন করা হয়। গোমাতার পূজা করে তাঁকে ঘাস ও খাবার দেওয়া হয়।
প্র. গোবর্ধন পূজাকে অন্নকূট বলা হয় কেন?
উ. এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের খাবার নিবেদন করা হয়। এই খাবারের সমষ্টিকে অন্নকূট বলা হয়। তাই গোবর্ধন পূজাকে অন্নকূট উৎসবও বলা হয়।
প্র. গোবর্ধন পূজার দিনে দান করার গুরুত্ব কী?
উ. গোবর্ধন পূজা সেবা, করুণা এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধার বার্তা দেয়। এই দিনে অভাবী মানুষকে খাবার, পোশাক এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দান করার মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করা যায়।