দীপাবলি নামটি শুনলেই মনে একটি সুন্দর দৃশ্য ভেসে ওঠে… সন্ধ্যার বেলা, ঘরের আঙিনায় মিটমিট করে জ্বলা মাটির প্রদীপ, রঙ-বেরঙের আলপনা (রঙ্গোলি), ফুল দিয়ে সাজানো দরজা আর পূজার থালায় ঝলমলে আরতি। মনে হয় যেন মর্ত্যে নক্ষত্রলোক নেমে এসেছে। এটি কেবল একটি উৎসবের দৃশ্য নয়, বরং ভারতীয় সংস্কৃতির সেই অমূল্য ঐতিহ্যের এক ঝলক, যার প্রতিটি রীতির পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো না কোনো সুন্দর বার্তা।
দীপাবলি আমাদের ভগবান শ্রীরামের অযোধ্যা প্রত্যাবর্তন, অধর্মের ওপর ধর্মের জয় এবং অন্ধকারের ওপর আলোর জয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই উৎসব বাড়ি সাজানোর পাশাপাশি সম্পর্কের মধ্যে মিষ্টতা আনা, মনের কলুষতা দূর করা এবং জীবনে নতুন আশাকে স্বাগত জানানোর সুযোগ করে দেয়।
আমাদের পূর্বপুরুষেরা দীপাবলির সাথে যুক্ত নানা ঐতিহ্য তৈরি করেছেন, যার উদ্দেশ্য উৎসবের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবারে শুভতা, প্রেম, সমৃদ্ধি ও ভালো সংস্কারের সঞ্চার করা। আসুন জেনে নিই দীপাবলির এমন পাঁচটি ঐতিহ্যের কথা, যা পালন করে আপনি আপনার ঘরকে আলোর পাশাপাশি ইতিবাচকতা ও আন্তরিকতায় ভরিয়ে তুলতে পারেন।
দীপাবলির প্রস্তুতি শুরু হয় বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই। ঘরের কোণে কোণে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পুরোনো জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা, দেয়াল সাজানো এবং পূজার স্থানকে সুন্দর রূপ দেওয়া এই উৎসবের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্য।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পরিষ্কার ও পরিপাটি ঘরেই দেবী লক্ষ্মী শুভ আগমন করেন। তাই দীপাবলির আগে ঘর পরিষ্কার করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই ঐতিহ্য আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখার সাথে সাথে নিজেদের মন ও চিন্তা ভাবনাকেও নির্মল করার অনুপ্রেরণা দেয়।
এই উপলক্ষে ঘরের ঠাকুরঘর বিশেষভাবে সাজিয়ে তুলুন। ভগবান শ্রীগণেশ, মা লক্ষ্মী এবং আপনার ইষ্ট দেব-দেবীর স্থান পরিষ্কার করুন। তাজা ফুল, সুগন্ধি ধূপ এবং সুন্দর বস্ত্রে পূজার স্থানটি সাজান। ঘরের প্রধান দরজা ও জানালাগুলোও পরিষ্কার রাখুন, যাতে পুরো উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে দীপাবলিকে স্বাগত জানানো যায়।
দীপাবলিতে ঘরের প্রধান দরজায় আঁকা আলপনা দেখলেই মন আনন্দে ভরে ওঠে। রঙে সাজানো সুন্দর পদ্ম, স্বস্তিক চিহ্ন, প্রদীপ এবং ঐতিহ্যবাহী নকশা ঘরের সৌন্দর্য বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। ভারতীয় ঐতিহ্যে আলপনাকে শুভতা, মঙ্গল এবং অতিথি সৎকারের প্রতীক বলে মনে করা হয়।
বিশ্বাস করা হয় যে, সুন্দর আলপনা এবং সাজানো দরজা দেবী লক্ষ্মীকে স্বাগত জানানোর প্রতীক। এই কারণেই দীপাবলিতে ঘরের প্রবেশদ্বার বিশেষভাবে সাজানো হয়।
আপনি চালের গুঁড়ো, প্রাকৃতিক রং, ফুলের পাপড়ি এবং হলুদ-কুমকুম দিয়ে আকর্ষণীয় আলপনা তৈরি করতে পারেন। এর সাথে আম বা অশোক পাতার তোরণ লাগান। গাদা ও গোলাপ ফুল দিয়ে তৈরি ফুলের মালাও ঘরকে একটি ঐতিহ্যবাহী ও মনোমুগ্ধকর রূপ দেয়। আলপনা আঁকার সময় শিশুদেরও সাথে রাখুন। তাদের ঐতিহ্যবাহী নকশা তৈরি করতে শেখান এবং এর ধর্মীয় গুরুত্ব সম্পর্কে জানান।
দীপাবলির সবচেয়ে সুন্দর ও আবেগপূর্ণ দৃশ্য হলো মাটির প্রদীপের সারি। সন্ধ্যার সময় যখন একে একে প্রদীপ জ্বালানো হয়, তখন তার কোমল আলো পুরো ঘরে এক অলৌকিক পরিবেশ তৈরি করে।
প্রদীপ জ্বালানোর ঐতিহ্যটি ভগবান শ্রীরামের চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে অযোধ্যায় ফেরার স্মৃতির সাথে জড়িত। বিশ্বাস করা হয় যে, প্রভু শ্রীরাম, মা সীতা এবং লক্ষ্মণজির আগমনের আনন্দে অযোধ্যাবাসী পুরো শহরকে প্রদীপে সাজিয়ে তুলেছিলেন। তখন থেকেই দীপাবলিতে প্রদীপ জ্বালানোর রীতি বিশেষ শ্রদ্ধার সাথে পালন করা হয়ে আসছে।
প্রদীপ ঘরকে আলোকিত করার পাশাপাশি আমাদের ভেতরের অজ্ঞতা, অহংকার, হিংসা ও নেতিবাচকতা দূর করার বার্তাও দেয়। বৃহদারণ্যক উপনিষদে একটি সুন্দর প্রার্থনা পাওয়া যায়—
অসতো মা সদগময়।
তমসো মা জ্যোতির্গময়।
মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়॥
অর্থ: হে প্রভু! আমাদের অসৎ থেকে সতের দিকে, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এবং মৃত্যু থেকে অমরত্বের দিকে নিয়ে চলুন।
এই দীপাবলিতে ঘরের ঠাকুরঘর, আঙিনা, তুলসীতলা এবং প্রধান দরজায় মাটির প্রদীপ জ্বালান। সম্ভব হলে স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের কাছ থেকে মাটির প্রদীপ কিনুন, যাতে তাঁদের জীবিকাতেও সাহায্য হয়। প্রদীপ জ্বালানোর সময় মনে মনে এই সংকল্প নিন যে, এই ছোট্ট প্রদীপটি যেভাবে অন্ধকার দূর করে, তেমনি আমরাও যেন কারও জীবনে আশা ও আনন্দের আলো ছড়িয়ে দিতে পারি।
দীপাবলির রাতে মা লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের পূজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। দেবী লক্ষ্মীকে ধন, বৈভব, ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনে করা হয়, অন্যদিকে ভগবান গণেশ হলেন বুদ্ধি, বিবেক ও মঙ্গলের প্রতীক। তাই দীপাবলিতে দুজনেরই একসাথে পূজা করার ঐতিহ্য রয়েছে।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অমাবস্যার পবিত্র রাতে শ্রদ্ধাভরে মা লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের পূজা করলে ঘরে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বিরাজ করে।
পূজার জন্য প্রথমেই পূজার স্থান পরিষ্কার করুন। পিঁড়ির ওপর লাল বা হলুদ কাপড় বিছিয়ে ভগবান গণেশ ও মা লক্ষ্মীর প্রতিমা স্থাপন করুন। তাঁদের ফুল, আতপ চাল, চন্দন, ধূপ, প্রদীপ ও নৈবেদ্য অর্পণ করুন। মা লক্ষ্মীকে পদ্মফুল এবং ভগবান গণেশকে দুর্বা অর্পণ করা শুভ বলে মনে করা হয়। এরপর শ্রীসূক্তম পাঠ করুন। শেষে বিধিনিয়ম মেনে লক্ষ্মী-গণেশের আরতি করুন এবং পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের কামনা করুন।
পূজার সময় পরিবারের সব সদস্য একসাথে বসুন। শিশুদের আরতি করতে ও মন্ত্র উচ্চারণ করতে বলুন। তাদের জানান যে, প্রকৃত সমৃদ্ধির অর্থ হলো সুস্থ পরিবার, মধুর সম্পর্ক, সন্তুষ্টি এবং অন্যদের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া।
দীপাবলির মিষ্টতা কেবল মিষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সেই সম্পর্কগুলোর মধ্যেও থাকে, যা আমরা আমাদের ভালোবাসা ও আপনত্ব দিয়ে গড়ে তুলি। এই দিনে সবাই আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের শুভেচ্ছা জানান এবং উপহার আদান-প্রদান করেন। এই ঐতিহ্য পুরোনো মান-অভিমান ভুলে গিয়ে সম্পর্কে নতুন মিষ্টতা আনার সুযোগ দেয়।
কিন্তু দীপাবলির আনন্দ কি কেবল আমাদের ঘরের মধ্যেই সীমিত থাকা উচিত? যে শিশুর থালায় একবেলা পেট ভরে খাবার নেই, তার জন্যও কি এই উৎসব সমান আনন্দদায়ক হওয়া উচিত নয়? যার উৎসব উদযাপনের কোনো মাধ্যম নেই, সেই অসহায় মানুষটির জীবনেও কি দীপাবলির আলো পৌঁছানো উচিত নয়?
সনাতন সংস্কৃতিতে দান ও সেবাকে শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলে মনে করা হয়েছে। তাই দীপাবলিতে নিজের আনন্দ অন্যদের সাথে ভাগ করে নেওয়াও এই উৎসবের এক সুন্দর ভাবনা। আপনি দুস্থ পরিবারগুলোকে খাবার, বস্ত্র ও মিষ্টি উপহার দিতে পারেন। দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার সামগ্রী দিতে পারেন এবং অসহায় মানুষদের চাহিদা পূরণে সাহায্য করতে পারেন।
এই দীপাবলিতে একটি প্রদীপ কোনো দুস্থ মানুষের নামেও জ্বালান। কোনো ক্ষুধার্তকে খাবার দিন, কোনো শিশুকে বাজি কিনে দিন, মিষ্টি খাওয়ান এবং কোনো হতাশ মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করুন। কারণ উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই বহু গুণ বেড়ে যায়, যখন আমাদের আনন্দের সাথে অন্যদের আনন্দও যুক্ত হয়।
দীপাবলির এই পাঁচটি ঐতিহ্য আমাদের জীবনের পাঁচটি সুন্দর নীতি শেখায়… পরিচ্ছন্নতা, শুভতা, আলো, শ্রদ্ধা এবং পরোপকার। ঘর পরিষ্কার করা আমাদের মনের কলুষতা দূর করার অনুপ্রেরণা দেয়। আলপনা ও তোরণ মঙ্গলময় চিন্তার সাথে জীবনকে স্বাগত জানাতে শেখায়। প্রদীপ অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস দেয়। লক্ষ্মী-গণেশের পূজা শ্রদ্ধা ও বিবেকের গুরুত্ব বোঝায়, আর মিষ্টি বিতরণ ও দুস্থদের সাহায্য করা আমাদের প্রেম ও করুণার প্রকৃত অর্থ শেখায়।
এই দীপাবলিতে আপনার ঘর প্রদীপে সাজান, আঙিনা রঙে ভরিয়ে তুলুন এবং আপনার হৃদয়কে প্রেম ও সৌহার্দ্যে আলোকিত করুন। প্রভু শ্রীরামের আদর্শ স্মরণ করুন, মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ লাভ করুন এবং আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী কোনো দুস্থ মানুষের জীবনেও আনন্দের আলো পৌঁছে দিন।
মনে রাখবেন, দীপাবলির সবচেয়ে সুন্দর প্রদীপ সেটিই, যার আলো অন্য কারও মুখে হাসি হয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই দীপাবলিতে কেবল নিজের ঘর নয়, বরং কোনো দুস্থ মানুষের জীবনকেও আলোকিত করার সংকল্প নিন।
আপনাদের সবাইকে দীপাবলির প্রীতি ও আন্তরিক শুভেচ্ছা।