09 October 2026

শারদীয়া নবরাত্রি ২০২৬ : ঘটস্থাপনার শুভ মুহূর্ত, পূজা পদ্ধতি এবং মা দুর্গার আরাধনার গুরুত্ব

Start Chat

যখন শরৎকালের মৃদু শীতলতা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন দেবী আরাধনার পাবন পর্ব শারদীয়া নবরাত্রি নিজের সাথে ভক্তি, শক্তি এবং সাধনার বার্তা নিয়ে আসে। নয় দিন ধরে চলা এই দিব্য পর্ব মা ভগবতির নয়টি রূপের উপাসনা এবং আত্মশুদ্ধির সুযোগ এনে দেয়। ভক্তগণ এই দিনগুলিতে মায়ের চরণে নিজেদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে ব্রত, পূজা, জপ, পাঠ, হোম এবং সেবার মাধ্যমে জীবনকে সাত্ত্বিক করে তোলার চেষ্টা করেন।

দেবীর মহিমা বর্ণনা করে দেবী মাহাত্ম্যে বলা হয়েছে—

যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।

নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ॥

অর্থাৎ, যে দেবী সমস্ত প্রাণীর মধ্যে শক্তিরূপে বিরাজমান, সেই জগদম্বাকে বারবার প্রণাম জানাই। এই শক্তিই নবরাত্রির প্রতিটি দিনে সাধকের মনে শ্রদ্ধা, আত্মবল এবং ইতিবাচক চেতনার সঞ্চার করে।

শারদীয়া নবরাত্রি ২০২৬ কবে থেকে শুরু হবে?

২০২৬ সালে শারদীয়া নবরাত্রির সূচনা ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ থেকে হবে। নবরাত্রির সমাপ্তি ২০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে মহানবমী ও বিজয়া দশমীর শুভ ক্ষণে ঘটবে। আশ্বিন শুক্ল পক্ষের প্রতিপদ তিথি ১০ অক্টোবরের রাত ৯:১৯ মিনিট থেকে ১১ অক্টোবরের রাত ৯:৩০ মিনিট পর্যন্ত থাকবে।

নবরাত্রির প্রথম দিনে ঘটস্থাপনার মাধ্যমে দেবী উপাসনার বিধিবদ্ধ সূচনা হয়। কলশকে দেবী শক্তির প্রতীক বলে মনে করা হয় এবং এর স্থাপনার মাধ্যমে সাধক নিজের ঘরে মা ভগ বতিকে আহ্বান জানান।

ঘটস্থাপনা মুহূর্ত: সকাল ০৬:১৯ মিনিট থেকে ১০:১২ মিনিট পর্যন্ত।

ঘটস্থাপনা সর্বদা শুভ মুহূর্তে বিধি-বিধান মেনে শ্রদ্ধাভরে করা শ্রেয় বলে মনে করা হয়।

নবরাত্রিতে মা দুর্গার নয়টি রূপের আরাধনা

নবরাত্রির নয়টি দিন মা ভগবতির নয়টি দিব্য রূপের প্রতি উৎসর্গীকৃত। প্রথম দিনে মা শৈলপুত্রী, দ্বিতীয় দিনে মা ব্রহ্মচারিণী, তৃতীয় দিনে মা চন্দ্রঘণ্টা, চতুর্থ দিনে মা কূষ্মাণ্ডা, পঞ্চম দিনে মা স্কন্দমাতা, ষষ্ঠ দিনে মা কাত্যায়নী, সপ্তম দিনে মা কালরাত্রি, অষ্টম দিনে মা মহাগৌরী এবং নবম দিনে মা সিদ্ধিদাত্রীর পূজা করা হয়।

মায়ের প্রতিটি রূপের নিজস্ব বিশিষ্ট মহিমা রয়েছে। কোনো রূপ সাধনা ও তপস্যার বার্তা দেয়, তো কোনো রূপ ভয় বিনাশ করে অভয় প্রদান করে। কোনো রূপে মাতৃত্বের করুণা দেখা যায়, তো কোনো রূপে অধর্ম বিনাশের প্রচণ্ড শক্তি। তাই নবরাত্রি কেবল বাহ্যিক পূজার উৎসব নয়, বরং এটি সাধককে নিজের ভেতরের লুকানো শক্তিকে চেনার সুযোগও করে দেয়।

নবরাত্রির ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব

মা দুর্গাকে আদিশক্তি, জগদম্বা এবং সংসারের পালনকর্ত্রী শক্তি হিসেবে পূজা করা হয়। দুর্গা সপ্তশতীতে দেবীর স্তুতি করে বলা হয়েছে—

সর্বমঙ্গলমাঙ্গল্যে শিভে সর্বার্থসাধিকে।

শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণি নমোহস্তু তে॥

অর্থাৎ, হে দেবী! তুমি সকল মঙ্গলের মঙ্গলস্বরূপা, কল্যাণদাত্রী এবং সকল মনোরথ পূর্ণকারী। হে শরণাগত রক্ষাকারিণী ত্রিনয়নধারিণী গৌরী, হে নারায়ণী! তোমাকে প্রণাম জানাই।

নবরাত্রির পর্ব এই শরণাগতির বার্তাই দেয়। মানুষ যখন নিজের অহংকার, ভয় এবং চিন্তা মায়ের চরণে উৎসর্গ করে, তখন তার মধ্যে বিশ্বাস ও আত্মবলের জাগরণ ঘটে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে মা ভগবতী মহিষাসুরের মতো অত্যাচারী অসুরদের সংহার করে ধর্মের রক্ষা করেছিলেন। দেবী ও মহিষাসুরের এই প্রসঙ্গ আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, যখন অধর্ম ও অহংকার বৃদ্ধি পায়, তখন দিব্য শক্তি তার বিনাশ ঘটিয়ে ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

তাই নবরাত্রির নয়টি দিন নিজের ভেতরের রাগ, লোভ, মোহ, অহংকার এবং নেতিবাচক চিন্তার ওপর বিজয় লাভ করার দিন বলে মনে করা হয়।

ঘটস্থাপনার পূজা পদ্ধতি

  • নবরাত্রির প্রথম দিনে প্রাতঃকালে স্নান করে পরিষ্কার ও সাত্ত্বিক বস্ত্র পরিধান করুন। পূজা স্থান পরিষ্কার করে গঙ্গাজল ছিটিয়ে পবিত্র করুন। এরপর কাঠের পিঁড়ি বা চৌকির ওপর পরিষ্কার কাপড় বিছিয়ে পূজার বেদিকা তৈরি করুন।

  • প্রথমে মাটিতে কিছুটা মাটি রেখে তাতে যব বা গম বপন করা হয়। এরপর কলশে পরিষ্কার জল ভরে তাতে সুপারি, মুদ্রা, অক্ষত (আতপ চাল) ইত্যাদি রাখুন। কলশের ওপর আমপাতা রেখে তার ওপর লাল কাপড়ে জড়ানো একটি নারকেল স্থাপন করুন।

  • এরপর মা দুর্গার প্রতিমা বা ছবি স্থাপন করুন। প্রদীপ প্রজ্বলিত করুন এবং ধূপ, পুষ্প, অক্ষত, রলি, কুমকুম, নৈবেদ্য ইত্যাদি অর্পণ করে মা ভগবতির পূজা করুন।

  • পূজার সময় শ্রদ্ধাভরে দেবী মন্ত্র জপ করুন। নবরাত্রির দিনগুলিতে দুর্গা সপ্তশতী পাঠ, দেবী কবচ, অর্গলা স্তোত্র এবং কীলক স্তোত্র পাঠ করাও শ্রদ্ধানুসারে অত্যন্ত শুভ।

  • সকাল ও সন্ধ্যায় মায়ের আরতি করুন এবং সাত্ত্বিক ভোগ নিবেদন করুন। এই দিনগুলিতে মন, বাক্য ও কর্মের শুদ্ধতার প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা উচিত।

নবরাত্রিতে ব্রত এবং সাত্ত্বিক আহার

নবরাত্রির সময় অনেক ভক্ত নিজের শ্রদ্ধা ও সামর্থ্য অনুসারে ব্রত বা উপবাস পালন করেন। ব্রত কেবল খাদ্য ত্যাগের নাম নয়, বরং মন ও ইন্দ্রিয়কে সংযত রাখার একটি মাধ্যম। এই দিনগুলিতে সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করা, ঈশ্বরের নাম স্মরণ করা, অসত্য ও কঠোর বাক্য পরিহার করা এবং অভাবীদের সেবা করা বিশেষ পুণ্যদায়ক বলে মনে করা হয়। নবরাত্রি সাধনার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মনকে বাহ্যিক বিকার থেকে সরিয়ে মায়ের চরণে একাগ্র করা।

কন্যা পূজা এবং সেবার গুরুত্ব

অষ্টমী ও নবমী তিথিতে কন্যা পূজার বিশেষ প্রথা রয়েছে। ছোট ছোট কন্যাপান্থীদের মা ভগবতির রূপ মনে করে তাদের পূজা করা হয়। তাদের শ্রদ্ধাভরে ভোজন করানো হয় এবং বস্ত্র, ফল, উপহার ও দক্ষিণা অর্পণ করা হয়।

কন্যা পূজা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মাতৃশক্তি কেবল মন্দিরে স্থাপিত প্রতিমাতেই নয়, বরং প্রতিটি কন্যা ও নারীর মধ্যেও বিরাজমান। অভাবীদের সাহায্য করা, অন্নদান করা, অসহায়দের সেবা করা এবং কারো জীবনে আশার প্রদীপ জ্বালানোও মা ভগবতির আরাধনারই এক সুন্দর রূপ।

নবরাত্রিতে সেবার সংকল্প নিন

সনাতন ঐতিহ্যে বলা হয় যে মা ভগবতির আরাধনা তাঁরই রূপ হিসেবে গণ্য ছোট ছোট কন্যাদের সেবায় নিহিত রয়েছে। শারদীয়া নবরাত্রির এই পাবন উপলক্ষে নারায়ণ সেবা সংস্থান ৫০১ জন অসহায় প্রতিবন্ধী কন্যার বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের সংকল্প নিয়ে তাদের জীবনে নতুন আশা জাগানোর পবিত্র কাজ করছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে জীবনের নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া এই কচি মেয়েদের জন্য আপনার সহযোগিতা তাদের হাঁটাচলা করতে, স্বাবলম্বী হতে এবং সম্মানের সাথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে।

আপনিও এই নবরাত্রিতে মা জগদম্বার আরাধনার পাশাপাশি এই নিষ্পাপ কন্যাদের জীবনে খুশির আলো নিয়ে আসার সংকল্প নিন। আপনার সহযোগিতায় কোনো একটি মেয়ের জীবনে নতুন আশার জন্ম হতে পারে এবং সেবার এই ভাবনা মা ভগবতির চরণে সচ্চা শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

 

 

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)

প্রশ্ন: শারদীয়া নবরাত্রি ২০২৬ কবে থেকে শুরু হবে?

উত্তর: শারদীয়া নবরাত্রি ২০২৬-এর সূচনা ১১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে হবে।

প্রশ্ন: শারদীয়া নবরাত্রি ২০২৬-এ ঘটস্থাপনা কবে করা হবে?

উত্তর: নবরাত্রি ২০২৬-এ ঘটস্থাপনা ১১ অক্টোবর করা হবে। ঘটস্থাপনার শুভ মুহূর্ত সকাল ০৬:১৯ মিনিট থেকে ১০:১২ মিনিট পর্যন্ত। অভিজিৎ মুহূর্ত সকাল ১১:৪৪ মিনিট থেকে দুপুর ১২:৩১ মিনিট পর্যন্ত থাকবে।

প্রশ্ন: শারদীয়া নবরাত্রি ২০২৬ কবে শেষ হবে?

উত্তর: শারদীয়া নবরাত্রি ২০২৬-এর সমাপ্তি ২০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে মহানবমীর সাথে ঘটবে।

প্রশ্ন: নবরাত্রিতে মা দুর্গার কোন নয়টি রূপের পূজা করা হয়?

উত্তর: নবরাত্রির নয় দিনে মা দুর্গার শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কূষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী এবং সিদ্ধিদাত্রী রূপের পূজা করা হয়।

প্রশ্ন: নবরাত্রিতে ঘটস্থাপনার জন্য কী কী উপকরণের প্রয়োজন হয়?

উত্তর: ঘটস্থাপনার জন্য সাধারণত কলশ, জল, সুপারি, মুদ্রা, আমপাতা, নারকেল, লাল কাপড়, অক্ষত, যব বা গম এবং পূজা সামগ্রী ব্যবহৃত হয়।

প্রশ্ন: নবরাত্রিতে কী দান করা শুভ বলে মনে করা হয়?

উত্তর: নবরাত্রিকে পূজার পাশাপাশি দান ও সেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ বলে মনে করা হয়। অভাবীদের খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা পুণ্যদায়ক।

X
Amount = INR