দীপাবলির পবিত্র উৎসবটি জীবন থেকে অন্ধকার দূর করে ধার্মিকতা, সৎ আচরণ ও মঙ্গলময়তাকে বরণ করে নেওয়ার এক স্বর্গীয় সুযোগ। ‘দীপোৎসব’-এর ধারায় নরক চতুর্দশীর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এটি ‘রূপ চৌদস’, ‘কালী চৌদস’ এবং ‘ছোট দীপাবলি’ নামেও পরিচিত। এই শুভ দিনটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বীরত্ব, মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং শরীর ও মনের শুদ্ধির সঙ্গে যুক্ত।
কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশ তিথিতে পালিত এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক রূপে নয়, বরং মনের পবিত্রতা, চিন্তার স্বচ্ছতা এবং কর্মের মহত্ত্বের মধ্যেই নিহিত। এই দিনে প্রদীপ জ্বালানো (‘দীপদান’), বিশেষ স্নান (‘অভ্যঙ্গ স্নান’) এবং ঈশ্বর আরাধনার মতো কিছু নির্দিষ্ট রীতি পালনের প্রচলন রয়েছে। বিশ্বাস করা হয় যে, ভক্তিভরে এই দিনের আচার-অনুষ্ঠান পালন করলে জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি আসে এবং ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ করা যায়।
নরক চতুর্দশী উৎসবটি দীপাবলির ঠিক একদিন আগে পালিত হয়। ২০২৬ সালে এটি ৮ই অক্টোবর উদযাপিত হবে। ‘দৃক পঞ্জিকা’ (হিন্দু পঞ্জিকা) অনুযায়ী, এই শুভ সময় বা ‘মুহূর্ত’ শুরু হবে ২০২৬ সালের ৭ই অক্টোবর সকাল ১০:৪৭ মিনিটে এবং তা চলবে পরদিন ৮ই অক্টোবর সকাল ১১:২৭ মিনিট পর্যন্ত। ‘উদয়া তিথি’ (সূর্যোদয়ের সময় যে তিথি বিদ্যমান থাকে) অনুযায়ী, নরক চতুর্দশী ৮ই অক্টোবর পালন করা হবে। ‘চতুর্দশী তিথি’র শুরু ও শেষের সময় স্থানীয় সূর্যোদয় এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তিত হতে পারে—যা বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের সময়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আপনার শহরে সঠিক সময় জানার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য স্থানীয় ‘পঞ্জিকা’ দেখে নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
এই দিনের প্রথাগুলোর মধ্যে রয়েছে ভোরে স্নান (‘অভ্যঙ্গ স্নান’), ভগবান কৃষ্ণের পূজা এবং সন্ধ্যায় যমরাজের (মৃত্যুর দেবতা) উদ্দেশ্যে প্রদীপ জ্বালানো। কিছু অঞ্চলে এটি ‘ছোট দিওয়ালি’ হিসেবে পালিত হয়, আবার পশ্চিম ভারতের অনেক জায়গায় এটি অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে ‘রূপ চৌদাস’ হিসেবে উদযাপিত হয়।
নরক চতুর্দশীর সঙ্গে ভগবান কৃষ্ণের হাতে নরকাসুর নামক অসুরের বধের কাহিনি জড়িয়ে আছে। ধর্মীয় গ্রন্থাবলির বর্ণনা অনুযায়ী, নরকাসুর নামে এক অসুর নিজের শক্তি ও অহঙ্কারে অন্ধ হয়ে বিভিন্ন লোকে অত্যাচার শুরু করেছিল। সে দেবতাদের হয়রানি করত এবং অনেক তরুণীকে বন্দি করে রেখেছিল। তার অত্যাচারে সমগ্র বিশ্ব অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। নরকাসুরের ত্রাসের রাজত্ব থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করতে ভগবান কৃষ্ণ তার রাজধানী প্রাগজ্যোতিষপুরে আক্রমণ করেন। সেই যুদ্ধে ভগবান কৃষ্ণ নরকাসুরকে বধ করেন, বন্দি নারীদের উদ্ধার করেন এবং পৃথিবীকে তার নিষ্ঠুর অত্যাচার থেকে মুক্তি দেন।
মনে করা হয়, নরকাসুরকে বধ করার ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতেই নরক চতুর্দশী পালন করা হয়। নরক চতুর্দশীর এই কাহিনি আমাদের শেখায় যে, যখন অধর্ম সব সীমা অতিক্রম করে যায়, তখন ধর্মকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে দিব্য শক্তির আবির্ভাব ঘটে। ভগবান কৃষ্ণের এই রূপটি ভক্তদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং সত্যের পথে চলতে অনুপ্রাণিত করে।
নরক চতুর্দশী ‘রূপ চৌদাস’ নামেও পরিচিত। এই দিনে ‘অভ্যঙ্গ স্নান’ (এক বিশেষ আচারমূলক স্নান)—যার মধ্যে শরীরে তেল মাখাও অন্তর্ভুক্ত—সম্পাদন করার এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার রীতি রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে নির্দিষ্ট রীতি মেনে স্নান করলে শারীরিক সৌন্দর্য ও সুস্বাস্থ্য লাভ হয়।
রূপ চৌদাসের তাৎপর্য কেবল শারীরিক সৌন্দর্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মনের পবিত্রতা, আচরণের মাধুর্য এবং চরিত্রের উৎকর্ষের সঙ্গেও যুক্ত। বাহ্যিক সৌন্দর্য সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যেতে পারে, কিন্তু দয়া, সহানুভূতি, সত্যবাদিতা ও সেবাপরায়ণতায় গঠিত ব্যক্তিত্ব চিরকাল শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকে।
এই দিনে শারীরিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পাশাপাশি নিজের চিন্তাভাবনাকে পবিত্র করার সংকল্প নেওয়া উচিত। ক্রোধ, ঈর্ষা, অহংকার ও বিদ্বেষের মতো দোষগুলো মানুষের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যকে নষ্ট করে দেয়। রূপ চৌদাসের উৎসব আমাদের এই নেতিবাচক গুণগুলো ত্যাগ করে প্রেম ও বিনয়কে গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করে।
নরক চতুর্দশীতে সূর্যোদয়ের আগে ‘অভ্যঙ্গ স্নান’ বা শাস্ত্রীয় স্নান করার একটি বিশেষ রীতি রয়েছে। এই রীতিতে স্নানের আগে শরীরে তেল মালিশ করা হয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি শুদ্ধি ও সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে ভোরে স্নান করলে ‘নরক’-এর ভয় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং জীবনে শুভত্বের আগমন ঘটে। অনেক পরিবারে স্নানের সময় ‘উবটান’ (ঐতিহ্যবাহী ভেষজ মিশ্রণ) এবং সুগন্ধি দ্রব্যও ব্যবহার করা হয়।
অভ্যঙ্গ স্নান সম্পাদনের পদ্ধতিটি নিম্নরূপ হতে পারে:
· খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নানের প্রস্তুতি নিন।
· আপনার পারিবারিক রীতি অনুযায়ী শরীরে তিলের তেল, সরিষার তেল বা অন্য কোনো উপযুক্ত তেল মালিশ করুন।
· স্নানের সময় পরমেশ্বরকে স্মরণ করুন এবং মনের শুদ্ধির জন্য প্রার্থনা করুন।
· স্নানের পর পরিচ্ছন্ন বস্ত্র পরিধান করুন এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অথবা আপনার আরাধ্য দেবতার (ইষ্টদেবতা) পূজা করুন।
· ইতিবাচক চিন্তা ও শুভ সংকল্পের মাধ্যমে আপনার দিনটি শুরু করুন।
অনুগ্রহ করে মনে রাখবেন, অভ্যঙ্গ স্নান সংক্রান্ত ধর্মীয় প্রথা অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। আপনার পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রচলিত রীতিগুলো অনুসরণ করাই শ্রেয়। নরক চতুর্দশীতে ‘যম দীপদান’
নরক চতুর্দশীতে যমরাজের (মৃত্যুর দেবতা) উদ্দেশ্যে প্রদীপ নিবেদনের একটি রীতি রয়েছে, যা ‘যম দীপদান’ নামে পরিচিত। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, নিষ্ঠার সঙ্গে এই আচার পালন করলে অকাল মৃত্যুর ভয় থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায় এবং পরিবারের কল্যাণের জন্য আশীর্বাদ লাভ করা যায়।
যমরাজকে ধর্ম ও ন্যায়বিচারের অধিষ্ঠাতা দেবতা হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর উদ্দেশ্যে প্রদীপ জ্বালানো জীবনের নশ্বরতাকে স্বীকার করার একটি প্রতীকী মাধ্যম; একই সঙ্গে এটি ন্যায়পরায়ণ জীবনযাপনের অঙ্গীকারকেও তুলে ধরে। যম দীপদানের জন্য সন্ধ্যায় বাড়ির বাইরে—অথবা প্রচলিত রীতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোনো স্থানে—একটি প্রদীপ স্থাপন করতে হয়। প্রদীপে তিলের তেল অথবা আপনার পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী উপযুক্ত কোনো তেল বা ঘি ব্যবহার করতে পারেন। প্রদীপ জ্বালানোর সময় যমরাজের কাছে আপনার পরিবারের সুরক্ষা ও একটি কল্যাণময় জীবনের জন্য প্রার্থনা করুন।
দীপোৎসবের সময় প্রদীপকে শুভত্ব ও আশার প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। এই সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে আপনার বাড়ির প্রধান প্রবেশদ্বারে এবং পূজার স্থানে স্থাপন করুন। এছাড়া, নরক চতুর্দশীতে প্রদীপ নিবেদনের (দীপদান) পাশাপাশি দানকার্য করার সংকল্প নিন। কোনো অভাবী পরিবারকে সহায়তা করুন।
সনাতন ঐতিহ্যে ‘সেবা’কে সর্বোত্তম কর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যখন কোনো ব্যক্তি অন্যের দুঃখ অনুভব করেন এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, তখন তাঁর মধ্যে করুণা ও বিনয়ের বিকাশ ঘটে। দীপাবলি উৎসবের প্রকৃত আনন্দ কেবল উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অন্যের জীবনে সুখ ও মর্যাদা বৃদ্ধি করার মধ্যেও নিহিত রয়েছে।
এই নরক চতুর্দশীতে যখন আপনি প্রদীপ জ্বালাবেন, তখন নিজের হৃদয়েও সদিচ্ছার শিখা প্রজ্বলিত করুন। পরমেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন যেন প্রতিটি পরিবার সুখ ও শান্তিতে পূর্ণ থাকে, সবাই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয় এবং সমাজে ভালোবাসা ও পরার্থপরতার মনোভাব বিকশিত হয়।
এই নরক চতুর্দশীতে ভগবান কৃষ্ণের কৃপায় আপনার জীবন থেকে সমস্ত অন্ধকার দূর হোক; আপনার গৃহ সুখ ও সমৃদ্ধিতে আলোকিত হয়ে উঠুক এবং ধর্ম ও সম্প্রীতির আলো আপনার প্রতিটি কর্মকে পথ দেখাক।
প্রশ্ন: ২০২৬ সালে নরক চতুর্দশী কবে পালিত হবে?
উত্তর: ২০২৬ সালে নরক চতুর্দশী ৮ই নভেম্বর পালিত হবে।
প্রশ্ন: নরক চতুর্দশীকে কেন ‘রূপ চৌদাস’ বলা হয়?
উত্তর: এই দিনে ‘অভ্যঙ্গ স্নান’ (বিশেষ স্নানবিধি) এবং শারীরিক ও মানসিক শুদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, যার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এই কারণেই একে ‘রূপ চৌদাস’ বলা হয়।
প্রশ্ন: নরক চতুর্দশীতে কোন দেবতার পূজা করা হয়? উত্তর: এই দিনে ভগবান কৃষ্ণের উপাসনার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে, কারণ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি নরকাসুর নামক অসুরকে পরাজিত করে বিশ্বকে তার অত্যাচার থেকে মুক্ত করেছিলেন। এছাড়া, যমরাজের (মৃত্যুর দেবতা) সম্মানেও প্রদীপ জ্বালানো হয়।
প্রশ্ন: নরক চতুর্দশীতে কেন ‘অভ্যঙ্গ স্নান’ (শাস্ত্রীয় স্নান) করা হয়? উত্তর: ‘অভ্যঙ্গ স্নান’ বা শাস্ত্রীয় স্নানকে শুদ্ধি ও শুভত্বের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, সূর্যোদয়ের আগে স্নান করা এই উৎসবের অন্যতম প্রধান রীতি।
প্রশ্ন: নরক চতুর্দশীতে কীভাবে ‘যম দীপদান’ (যমরাজের উদ্দেশ্যে প্রদীপ জ্বালানো) করতে হয়?
উত্তর: সন্ধ্যায় আপনার পারিবারিক রীতি মেনে প্রদীপ জ্বালান এবং পরিবারের মঙ্গল ও সুরক্ষার জন্য প্রার্থনা করুন।