11 September 2026

ভাদ্রপদ পূর্ণিমা ২০২৬: তিথি, পূজার বিধি, ব্রত, ধর্মীয় গুরুত্ব এবং দানের পুণ্য

Start Chat

সনাতন ধর্মে পূর্ণিমাকে ভক্তি ও পুণ্যকর্মের এক পবিত্র সময় হিসেবে মনে করা হয়। আকাশে চন্দ্রদেব যখন তাঁর শীতল জ্যোৎস্না ছড়িয়ে দেন, তখন ভক্তদের মনও ঈশ্বরের ভক্তিতে নিমগ্ন হয়ে ওঠে। ভাদ্রপদ মাসের পূর্ণিমা এই আধ্যাত্মিক অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে। এই দিন ভগবান বিষ্ণুর সত্যনারায়ণ রূপের পূজা, ব্রত, সত্যনারায়ণ কথা শ্রবণ, জপ, দান ও সেবার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

ভাদ্রপদ পূর্ণিমার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়, কারণ এর পরেই পিতৃপক্ষ শুরু হয়। তাই এই তিথি ভগবানের প্রতি ভক্তি নিবেদনের পাশাপাশি পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং তাঁদের উদ্দেশ্যে পুণ্যকর্ম করার অনুপ্রেরণা দেয়।

কথিত আছে, যেখানে ভক্তি থাকে, সেখানে সেবার অনুভূতি আপনাআপনিই জন্ম নেয়। তাই এই পূর্ণিমায় পূজার থালির পাশাপাশি কোনো অভাবী মানুষের জন্য এক থালা খাবার পরিবেশন করাও পরমাত্মার প্রতি সত্যিকারের ভক্তির একটি সুন্দর রূপ।

 

ভাদ্রপদ পূর্ণিমা ২০২৬ কবে?

পঞ্জিকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভাদ্রপদ পূর্ণিমা ২৬ সেপ্টেম্বর পালিত হবে। পূর্ণিমা তিথি ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ১১:০৬ মিনিটে শুরু হয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত ১০:১৮ মিনিটে শেষ হবে। উদয় তিথির মান্যতা অনুযায়ী ব্রত, পূজা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে পালন করা শুভ হবে।

 

ভগবান সত্যনারায়ণের পূজা

ভাদ্রপদ পূর্ণিমায় ভগবান বিষ্ণুর সত্যনারায়ণ রূপের পূজা এবং সত্যনারায়ণ কথা শ্রবণের প্রথা রয়েছে। ভক্তরা সকালে স্নান করে পরিষ্কার পোশাক পরুন এবং পূজার স্থান পবিত্র করে ভগবান সত্যনারায়ণের মূর্তি বা ছবি স্থাপন করুন। এরপর ভগবানকে চন্দন, অক্ষত, ফুল, তুলসী পাতা, ধূপ ও প্রদীপ নিবেদন করুন। পঞ্চামৃত দিয়ে অভিষেক করে ফল, মিষ্টি এবং সাত্ত্বিক নৈবেদ্য অর্পণ করুন। এরপর ভক্তিভরে সত্যনারায়ণ কথা পাঠ বা শ্রবণ করুন। পূজার সময় সদ্বুদ্ধি, সেবার মনোভাব, পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধি এবং সকল জীবের কল্যাণের জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করুন।

শান্তাকারং ভুজগশয়নং পদ্মনাভং সুরেশম।
বিশ্বাধারং গগনসদৃশং মেঘবর্ণং শুভাঙ্গম॥

ভগবান বিষ্ণুর এই দিব্য রূপ স্মরণ করে তাঁকে প্রণাম করুন।

 

ভাদ্রপদ পূর্ণিমার ব্রত

সনাতন পরম্পরায় পূর্ণিমার ব্রতকে আত্মশুদ্ধির একটি সাধনা হিসেবে মনে করা হয়। ভক্তরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী উপবাস পালন করতে পারেন এবং সারাদিন ভগবানের নামস্মরণ, মন্ত্রজপ, ভজন ও কথা শ্রবণে সময় কাটাতে পারেন। তবে এই ব্রতের প্রকৃত অর্থ শুধু অন্নত্যাগ নয়। ক্রোধ ত্যাগ করা, অহংকার থেকে দূরে থাকা, কঠোর কথা বলা এড়িয়ে চলা এবং নেতিবাচক চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে রাখাও ব্রতকে সার্থক করে তোলে।

এই দিনে মন, কথা এবং কর্মকে ঈশ্বরের ভক্তির সঙ্গে যুক্ত করার সংকল্প নিন। কারও সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলুন, কোনো দুঃখী মানুষকে সহায়তা করুন এবং কোনো অভাবী ব্যক্তির পাশে দাঁড়ান। কারণ উপবাসের সঙ্গে যখন করুণা যুক্ত হয়, তখন সাধনা সেবার রূপ ধারণ করে।

 

চন্দ্রদেবকে অর্ঘ্য দিয়ে মনের শান্তি লাভ করুন

পূর্ণিমার রাতে চন্দ্রদেবকে অর্ঘ্য দেওয়ার প্রথা রয়েছে। চন্দ্রদর্শনের পর পরিষ্কার জল, দুধ এবং ফুল নিবেদন করে চন্দ্রদেবকে স্মরণ করুন। এরপর ভগবান বিষ্ণুর ধ্যান করে পরিবারের সুখ, শান্তি ও মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করুন। পূর্ণিমার শান্ত জ্যোৎস্নায় কিছুক্ষণ ভগবানের নামস্মরণ করুন। সংসারের চিন্তা থেকে মনকে দূরে সরিয়ে নিজেকে পরমাত্মার চরণে সমর্পণ করুন।

 

ভাদ্রপদ পূর্ণিমায় দান

সনাতন পরম্পরায় দানকে ধর্ম ও পুণ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মনে করা হয়। দানের মূল্য তার পরিমাণ দিয়ে নয়, বরং তার পিছনে থাকা অনুভূতি দিয়ে নির্ধারিত হয়। যখন কোনো অভাবী মানুষের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের মতো মনে করে সাহায্য করা হয়, তখন দান সত্যিকারের পরোপকারে পরিণত হয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-র ১৭তম অধ্যায়ের ২০তম শ্লোকে দানের মাহাত্ম্য বলা হয়েছে—

দাতব্যমিতি যদ্দানং দীযতেऽনুপকারিণে।
দেশে কালে চ পাত্রে চ তদ্দানং সাত্ত্বিকং স্মৃতম্॥

অর্থাৎ, কোনো প্রতিদানের আশা না করে উপযুক্ত সময় ও স্থানে যোগ্য ব্যক্তিকে যে দান করা হয়, তা সাত্ত্বিক দান হিসেবে বিবেচিত হয়।

তাই ভাদ্রপদ পূর্ণিমায় আপনার ভক্তিকে কোনো অভাবী মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করুন। অন্নদান হোক বা কোনো অসহায় মানুষকে সাহায্য করা—সেবার প্রতিটি অনুভূতিই ঈশ্বরের চরণে নিবেদিত পুণ্যকর্মে পরিণত হয়।

 

অভাবী শিশুদের থালিতে পৌঁছে দিন খাবার

খাবার কোনো অভাবী মানুষের জীবনে আশা ও আপনজনের অনুভূতি এনে দিতে পারে। ভাদ্রপদ পূর্ণিমার এই পবিত্র উপলক্ষে নারায়ণ সেবা সংস্থান দীন-দুঃখী, অসহায়, দরিদ্র এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য খাদ্যসেবার আয়োজন করছে।

আপনিও এই পবিত্র সেবা প্রকল্পে নিজের সামর্থ্য ও শ্রদ্ধা অনুযায়ী সহযোগিতা করে কোনো অভাবী মানুষের জীবনে খাবার ও হাসি পৌঁছে দেওয়ার পুণ্য অর্জন করতে পারেন। ভগবান সত্যনারায়ণের চরণে করা প্রার্থনার সঙ্গে যখন সেবার সংকল্প যুক্ত হয়, তখন এই উৎসব আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। এই ভাদ্রপদ পূর্ণিমায় সেবা ও করুণাকে আপনার ভক্তির অংশ করে তুলুন।

 

ভাদ্রপদ পূর্ণিমায় নিন সেবার সংকল্প

ভাদ্রপদ পূর্ণিমা সেবা ও পরোপকারের অনুভূতিকে জীবনে গ্রহণ করার একটি পবিত্র সুযোগ। এই দিনে ভগবান সত্যনারায়ণ ও মা লক্ষ্মীর স্মরণ করে প্রার্থনা করুন, যাতে আমরা সবসময় অন্যের সুখ-দুঃখ বুঝতে পারি এবং প্রয়োজনের সময় তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা আমাদের মধ্যে বজায় থাকে।

নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কোনো অভাবী মানুষকে খাবার খাওয়ান, কোনো অসহায় ব্যক্তিকে সাহায্য করুন অথবা দান-পুণ্যের কোনো কাজে যুক্ত হন। কারণ আপনার সামান্য সহযোগিতায় যখন কোনো অভাবী মানুষের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে, তখন সেই সেবাই আত্মাকে সত্যিকারের আনন্দ দেয়।

এই ভাদ্রপদ পূর্ণিমায় ভগবানের পূজার পাশাপাশি সেবারও সংকল্প নিন এবং আপনার ভক্তিকে কোনো অভাবী মানুষের জীবনে আনন্দ আনার একটি মাধ্যম করে তুলুন।
 

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQs)

প্রশ্ন: ভাদ্রপদ পূর্ণিমা ২০২৬ কবে পালিত হবে?
উত্তর: ভাদ্রপদ পূর্ণিমা ২০২৬ সালে ২৬ সেপ্টেম্বর পালিত হবে।

প্রশ্ন: ভাদ্রপদ পূর্ণিমায় কোন দেবতার পূজা করা উচিত?
উত্তর: এই দিনে ভগবান বিষ্ণুর সত্যনারায়ণ রূপের পূজা বিশেষ ফলদায়ক বলে মনে করা হয়। পাশাপাশি মা লক্ষ্মী এবং চন্দ্রদেবেরও স্মরণ ও পূজা করা যেতে পারে।

প্রশ্ন: ভাদ্রপদ পূর্ণিমায় কী দান করা উচিত?
উত্তর: ভাদ্রপদ পূর্ণিমায় অন্নদান করা পুণ্যদায়ক বলে মনে করা হয়।

প্রশ্ন: ভাদ্রপদ পূর্ণিমার সঙ্গে পিতৃপক্ষের কী সম্পর্ক রয়েছে?
উত্তর: ভাদ্রপদ পূর্ণিমার পর পিতৃপক্ষ শুরু হয়। এই সময়টি পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য পবিত্র বলে মনে করা হয়।

X
Amount = INR