10 August 2026

৪৭তম দিব্যাঙ্গ ও নিঃস্ব সমষ্টিগত বিবাহ অনুষ্ঠান ২০২৬

Start Chat

ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতিতে বিবাহ হল দুই পরিবার ও জীবন-যাত্রার পবিত্র আত্মিক সংগম। বেদ-পুরাণে বর্ণিত ঐতিহ্য অনুসারে, অগ্নিকে সাক্ষী করে নেওয়া সাতটি পরিক্রমা জীবনভর সুখ-দুঃখের সাথে একসঙ্গে থাকা, ধর্ম পালন করা এবং মর্যাদার সাথে গৃহস্থ আশ্রমে প্রবেশ করার অখণ্ড সংকল্প। এই পবিত্র বৈবাহিক ঐতিহ্যকে মানবসেবা, করুণা ও সামাজিক সমরসতার সাথে যুক্ত করে নারায়ণ সেবা সংস্থান উদয়পুরের ঐতিহাসিক মাটিতে ‘৪৭তম দিব্যাঙ্গ ও নিঃস্ব সমষ্টিগত বিবাহ অনুষ্ঠান’-এর ভব্য আয়োজন করতে চলেছে।

এই দুই দিনের বিবাহ মহাকুম্ভ আগামী ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে উদয়পুরের লিও কা গুড়া, বড়ি-তে অবস্থিত সংস্থার ‘সেবা মহাতীর্থ’ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে। এই আয়োজন শতাধিক দিব্যাঙ্গ ও অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত যুবক-যুবতীর জীবনে আশা, আত্মসম্মান ও নতুন আলোর ভোর নিয়ে আসছে, যারা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বা দারিদ্র্যের কারণে বিবাহের মৌলিক সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।

সেবা মহাতীর্থে সাজবে মণ্ডপ, গুঞ্জরিত হবে বৈদিক মন্ত্র

হ্রদের নগরী উদয়পুরে অনুষ্ঠিতব্য এই সমষ্টিগত বিবাহ মানবতা ও আস্থার অদ্ভুত সংগম হবে। দুই দিনব্যাপী এই উৎসবে ঐতিহ্যবাহী রীতি-রীতি অনুসারে বিবাহ মণ্ডপ সাজানো হবে। বিদ্বান পণ্ডিতদের সান্নিধ্যে বৈদিক মন্ত্রের মঙ্গলধ্বনি গুঞ্জরিত হবে এবং শহনাইয়ের সুরের মাঝে নিঃস্ব ও দিব্যাঙ্গ বর-বধূ একে অপরের হাত ধরে সাত জন্মের অটুট বন্ধনে আবদ্ধ হবে।

নারায়ণ সেবা সংস্থানের এই অনুষ্ঠান সেই অসহায় পরিবারগুলোর জন্য সহায়ক, যাদের জন্য কন্যাদান করা বা বিবাহের বিশাল খরচ বহন করা একটি চ্যালেঞ্জ। সামাজিক কুরিতি ও অর্থনৈতিক অক্ষমতাকে সরিয়ে রেখে সংস্থা এমন দম্পতিদের পূর্ণ মর্যাদা ও সম্মানের সাথে নতুন জীবনে প্রবেশের সুযোগ প্রদান করে।

গণপতি স্থাপনা থেকে পাণিগ্রহণ পর্যন্ত

সনাতন ধর্মে প্রতিটি মাঙ্গলিক কাজের শুরু হয় বিঘ্নহর্তা ভগবান শ্রী গণেশের আরাধনা দিয়ে। এই ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসারে সমষ্টিগত বিবাহ অনুষ্ঠানের শুরুও গণেশ পূজার মাধ্যমে করা হবে।

বক্রতুণ্ড মহাকায সূর্যকোটি সমপ্রভ। নির্বিঘ্নং কুরু মে দেব শুভকার্যেষু সর্বদা॥

ভগবান গণেশের কাছে প্রার্থনা যে তিনি নবদম্পতির জীবন থেকে সমস্ত বিঘ্ন, বাধা ও কষ্ট দূর করুন এবং তাদের গৃহস্থ জীবনকে সুখ, শান্তি, প্রেম ও সমৃদ্ধিতে পূর্ণ করুন।

বিবাহের মাঙ্গলিক রীতিসমূহ

অনুষ্ঠানের সময় শাস্ত্রীয় বিধি-বিধান অনুসারে সমস্ত ঐতিহ্যবাহী রীতি আয়োজন করা হবে।

  • হলুদ ও মেহেদি রীতি: বধূ ও বরের হাতে মেহেদি ও হলুদের লেপ দিয়ে উৎসবের শুরু হবে, যা জীবনে নতুন রং ও সৌভাগ্যের প্রতীক।
  • সঙ্গীত ও বিন্দৌলি: ঐতিহ্যবাহী লোকগান, সঙ্গীতময় ভজন ও আনন্দোৎসবের মাঝে ভব্য সঙ্গীত সন্ধ্যা আয়োজন করা হবে। সঙ্গে ঢোল-নগাড়ার সাথে বিন্দৌলি বের করা হবে।
  • বর নিকাসি ও তোরণ রীতি: বাদ্যযন্ত্র ও বরাতের সাথে বর মণ্ডপের দিকে রওনা হবে, যেখানে দ্বারপূজা ও তোরণ মারার রীতি হবে।
  • পাণিগ্রহণ সংস্কার: পণ্ডিতদের উচ্চারিত বেদোক্ত মন্ত্রের মাঝে অগ্নিদেব ও দেবপ্রতিমাকে সাক্ষী করে দম্পতিরা ফেরা নেবে এবং সাত জন্ম একসঙ্গে থাকার সংকল্প নেবে।

৪৭তম সমষ্টিগত বিবাহ অনুষ্ঠানে কে অংশগ্রহণ করতে পারবেন?

এই পবিত্র সমষ্টিগত বিবাহ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করা প্রয়োজন।

  • বিবাহের জন্য বর-বধূ আগে থেকেই জোড়া বাঁধা থাকা প্রয়োজন।
  • বধূর বয়স ১৮ বছরের বেশি হতে হবে।
  • বরের বয়স ২১ বছরের বেশি হতে হবে।
  • বর বা বধূর মধ্যে একজন দিব্যাঙ্গ হতে হবে অথবা উভয়েই অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হতে হবে।
  • বিবাহ হিন্দু ধর্মীয় রীতি-রীতি ও ঐতিহ্য অনুসারে সম্পন্ন করা হবে।

আবেদন কীভাবে করবেন?

যেসব যোগ্য আবেদনকারী এই সমষ্টিগত বিবাহ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের নতুন জীবনের শুরু করতে চান, তারা সংস্থার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট www.narayanseva.org গিয়ে অনলাইন আবেদন পূরণ করতে পারেন। এছাড়াও তথ্য ও নিবন্ধন সহায়তার জন্য সংস্থার টেলিফোন নম্বর ০২৯৪-৬৬২২২২২-এ যোগাযোগ করা যেতে পারে।

বর-বধূর জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যের ব্যবস্থা

নিঃস্ব ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলোর জন্য মেয়ে ও ছেলের বিবাহ আয়োজন করা একটি বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। পোশাক, গহনা, সাজসজ্জা, প্রীতিভোজ ও গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ব্যবস্থা করা প্রতিটি পরিবারের সাধ্যের মধ্যে নয়। নারায়ণ সেবা সংস্থান এই চিন্তা সম্পূর্ণভাবে দূর করে দেয়। বিবাহ অনুষ্ঠানের সমস্ত ব্যবস্থাপনা সংস্থা দাতাদের সহযোগিতায় বিনামূল্যে করে থাকে।

কন্যাদান ও বিবাহ সেবায় অংশগ্রহণ করুন

সনাতন ঐতিহ্যে দানকে আত্মার শুদ্ধি ও পরম পুণ্য লাভের উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে কোনো অসহায় বা দিব্যাঙ্গ কন্যার কন্যাদান করা এবং তার গৃহস্থ জীবনে সহযোগিতা করা শাস্ত্রে সর্বোচ্চ সেবা বলে বর্ণিত। বলা হয়—

কন্যাদানমহং পুণ্যং স্বর্গং মোক্ষং চ বিন্দতি।

অর্থাৎ যে ব্যক্তি ভক্তি ও সেবাভাব নিয়ে কন্যাদানের অনুষ্ঠান করে বা তাতে অংশগ্রহণ করে, সে মহান পুণ্যের ভাগীদার হয়ে স্বর্গ ও মোক্ষ মার্গের অধিকারী হয়।

যখন কোনো ব্যক্তি কোনো দিব্যাঙ্গ বা নিঃস্ব কন্যার বিবাহে তার ছোট্ট অবদানও অর্পণ করে, তখন তা কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, বরং তা কোনো কন্যার মুখের হাসি, কোনো অসহায় মা-বাবার মাথার চিন্তার বোঝা সরানো এবং একটি নতুন পরিবার গঠনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

পরোপকারই মানব জীবনের আসল উদ্দেশ্য

সংস্থার সভাপতি ‘সেবক’ প্রশান্ত ভাইয়া বলেন যে সমাজের উন্নতি কেবল ভৌত উন্নতির মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং বঞ্চিত শ্রেণিকে সাথে নিয়ে চলার মাধ্যমে সম্ভব। আমাদের ধর্মগ্রন্থও একই শিক্ষা দেয়—

পরোপকারায় ফলন্তি বৃক্ষাঃ, পরোপকারায় বহন্তি নদ্যঃ। পরোপকারায় দুহন্তি গাবঃ, পরোপকারার্থমিদং শরীরম্॥

যেমন গাছ অন্যদের ছায়া ও ফল দেওয়ার জন্য ফল ধরে, নদী অন্যদের তৃষ্ণা মেটাতে প্রবাহিত হয় এবং গাভী অন্যদের পুষ্টির জন্য দুধ দেয়, তেমনি মানুষের এই শরীর ও জীবনও পরোপকার ও সেবা কর্মের জন্যই।

নারায়ণ সেবা সংস্থান কর্তৃক আগামী ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে উদয়পুরে অনুষ্ঠিতব্য এই ৪৭তম দিব্যাঙ্গ ও নিঃস্ব সমষ্টিগত বিবাহ অনুষ্ঠানকে সনাতন সংস্কারের মহাকুম্ভ বানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। সকল দাতা সজ্জন তাদের শ্রদ্ধা ও সামর্থ্য অনুসারে এই পবিত্র উপলক্ষে সেবার সংকল্প নিন এবং কোনো নতুন দম্পতির গৃহস্থ জীবনের সুন্দর শুরুর অংশীদার হোন।

X
Amount = INR