30 June 2026

যোগিনী একাদশী ২০২৬: সকল পাপ থেকে মুক্তি ও ভগবান বিষ্ণুর কৃপা লাভের এক দিব্য সুযোগ

Start Chat

সনাতন ধর্মে ‘একাদশী’ ব্রত ভগবান শ্রীহরি বিষ্ণুর উপাসনার জন্য অত্যন্ত পবিত্র ও শুভ বলে মনে করা হয়। প্রতি চান্দ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষ ও শুক্লপক্ষে আগত একাদশী ভক্তদের আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং ঈশ্বরের কৃপা লাভের সুযোগ করে দেয়। এই সকল একাদশীর মধ্যে আষাঢ় মাসের কৃষ্ণপক্ষে পালিত ‘যোগিনী একাদশী’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, যোগিনী একাদশীর ব্রত পালন করলে সকল জানা-অজানা পাপ বিনষ্ট হয়, নানা রোগব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং পরিশেষে মোক্ষলাভের পথ সুগম হয়।

শাস্ত্রে বলা হয়েছে, যে ভক্ত সম্পূর্ণ ভক্তি ও বিধি-বিধান মেনে যোগিনী একাদশীর ব্রত পালন করেন, তিনি বৃহৎ যজ্ঞ, পবিত্র তীর্থযাত্রা এবং দানধর্মের সমতুল্য পুণ্যফল লাভ করেন। তাই এই দিনে ভক্তরা উপবাস, নামস্মরণ, ধ্যান, পূজা এবং দানধর্মে অংশগ্রহণ করেন।

যোগিনী একাদশী ২০২৬ কবে?

দৃক পঞ্চাঙ্গ অনুসারে, যোগিনী একাদশীর ব্রত শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬ তারিখে পালন করা হবে।

  • একাদশী তিথি শুরু: ১০ জুলাই ২০২৬, সকাল ৮:১৬ মিনিট
  • একাদশী তিথি শেষ: ১১ জুলাই ২০২৬, ভোর ৫:২২ মিনিট

হিন্দু প্রথা অনুযায়ী সূর্যোদয়ের সময় যে তিথি বর্তমান থাকে, সেটিকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই ১০ জুলাই ২০২৬ তারিখে যোগিনী একাদশী পালন করা হবে।

পারণ (উপবাস ভঙ্গের সময়)

  • ১১ জুলাই ২০২৬
  • দুপুর ১:৫৯ মিনিট থেকে বিকেল ৪:৩৭ মিনিট পর্যন্ত

যোগিনী একাদশীর আধ্যাত্মিক গুরুত্ব

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে যোগিনী একাদশীর মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। এই একাদশী সকল পাপ নাশ করে এবং অসীম আধ্যাত্মিক পুণ্য প্রদান করে বলে বিশ্বাস করা হয়।

শাস্ত্র অনুযায়ী, ৮৮,০০০ জন ব্রাহ্মণকে ভোজন করানোর যে পুণ্য লাভ হয়, যোগিনী একাদশীর ব্রত পালন করলেও সেই সমপরিমাণ পুণ্য অর্জিত হয়।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বলা হয়েছে—

অষ্টাশীতিসহস্রাণি দ্বিজান্ ভোজয়তে তু যঃ।

তৎফলং সমবাপ্নোতি যোগিনী-ব্রত-কৃত্ নরঃ॥

অর্থ: যে ব্যক্তি যোগিনী একাদশীর ব্রত পালন করেন, তিনি ৮৮ হাজার ব্রাহ্মণকে ভোজন করানোর সমান পুণ্য লাভ করেন। এই পবিত্র ব্রত সকল পাপ ধ্বংস করে এবং অসীম আধ্যাত্মিক ফল প্রদান করে।

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই ব্রত শুধু পাপমুক্তিই দেয় না, বরং জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি, সুস্বাস্থ্য এবং মানসিক শান্তি নিয়ে আসে। ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় জীবনের বাধা-বিপত্তি দূর হয় এবং ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ—এই চার পুরুষার্থ অর্জনের পথে সহায়তা মেলে।

যোগিনী একাদশী ব্রত পালনের বিধি

যোগিনী একাদশীর দিন ব্রহ্মমুহূর্তে জেগে উঠে পবিত্র স্নান করে উপবাসের সংকল্প নিতে হবে।

এরপর পূজাস্থানে ভগবান বিষ্ণু ও মা লক্ষ্মীর মূর্তি বা ছবি স্থাপন করে ভক্তিভরে পূজা করতে হবে।

পূজায় নিম্নলিখিত উপকরণ অর্পণ করা উচিত—

  • ধূপ
  • ঘিয়ের প্রদীপ
  • নৈবেদ্য
  • হলুদ রঙের ফুল
  • হলুদ রঙের সামগ্রী
  • মৌসুমি ফল

ভগবান বিষ্ণুর সামনে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে আরতি করতে হবে। এই দিনে ‘বিষ্ণু সহস্রনাম’ পাঠ করা এবং ‘একাদশী ব্রতকথা’ শ্রবণ করা অত্যন্ত ফলদায়ক বলে মনে করা হয়।

ভক্তরা নিজেদের সামর্থ্য ও পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী নির্জলা উপবাস, শুধু জল গ্রহণ করে উপবাস অথবা ফলাহার গ্রহণ করে উপবাস পালন করতে পারেন। এছাড়া রাত্রিতে জাগরণ করে ভজন, কীর্তন এবং ঈশ্বরের নামস্মরণ করাও অত্যন্ত শুভ বলে বিবেচিত হয়।

উপবাসের সময় পালনীয় গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম

যোগিনী একাদশী শুধু পূজার দিন নয়, এটি চিন্তা, বাক্য এবং কর্মে পবিত্রতা আনারও একটি বিশেষ সুযোগ। তাই ভক্তদের নিম্নলিখিত নিয়মগুলি পালন করা উচিত—

  • তামসিক খাদ্য (মাংসাহার বা অতিরিক্ত মশলাযুক্ত খাবার) পরিহার করতে হবে।
  • মিথ্যা কথা বলা যাবে না।
  • রাগ, ঝগড়া এবং কটু বাক্য ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • অপ্রয়োজনীয় আলাপ এড়িয়ে আধ্যাত্মিক চিন্তায় মনোনিবেশ করতে হবে।
  • ভগবান বিষ্ণুর নাম জপ করতে হবে।
  • সম্ভব হলে রাত্রিজাগরণ করে ভক্তি ও ধ্যানে সময় ব্যয় করতে হবে।

যোগিনী একাদশীতে দানধর্মের গুরুত্ব

সনাতন ধর্মে দান ধর্মের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়। শাস্ত্র অনুযায়ী, দান শুধু বস্তু প্রদান নয়, এটি করুণা, সেবা এবং নিঃস্বার্থতার প্রকাশ। একাদশীর মতো পবিত্র দিনে করা দান বহুগুণ পুণ্যফল প্রদান করে।

যোগিনী একাদশীতে নিম্নলিখিত দান করা বিশেষ শুভ বলে মনে করা হয়—

  • অন্ন ও শস্যদান
  • ফল ও মিষ্টান্ন
  • জলভর্তি মাটির কলস
  • দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য ভোজনের ব্যবস্থা

শাস্ত্রে দানধর্মের মাহাত্ম্য

ভারতীয় সংস্কৃতিতে দানধর্ম সর্বদাই সর্বোচ্চ মর্যাদা পেয়েছে। মহর্ষি দধীচি, দানবীর কর্ণ এবং রাজা রন্তিদেবের কাহিনি নিঃস্বার্থ দানের উজ্জ্বল উদাহরণ।

মহাকবি ভর্তৃহরি তাঁর ‘নীতি শতক’-এ দানের মাহাত্ম্য সম্পর্কে বলেছেন—

দানেন ভূতানি বশী ভবন্তি দানেন বৈরাণ্যপি যান্তি নাশম্।

পরোऽপি বন্ধুত্বমুপৈতি দানৈর্দানং হি সর্বব্যসনানি হন্তি॥

অর্থ: দানের মাধ্যমে সকল প্রাণী আপন হয়ে ওঠে, শত্রুতাও বিনষ্ট হয়। দানের ফলে অপরিচিত ব্যক্তিও আত্মীয়ে পরিণত হয় এবং দান জীবনের সকল দুঃখ-কষ্ট দূর করার শক্তি রাখে।

যখন আমরা ক্ষুধার্তকে অন্ন দিই, তৃষ্ণার্তকে জল দিই অথবা অসহায় মানুষকে সাহায্য করি, তখন সেই সেবা সরাসরি ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে যায়।

যোগিনী একাদশীতে অন্নদানের পুণ্য

শাস্ত্রে অন্নদান সকল দানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে বর্ণিত হয়েছে, কারণ অন্নই জীবনের ভিত্তি।

যোগিনী একাদশীর মতো পবিত্র দিনে ক্ষুধার্ত, দরিদ্র, প্রতিবন্ধী এবং অভাবগ্রস্ত মানুষদের আহার করানো অত্যন্ত পুণ্যময় কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই পবিত্র দিনে, নারায়ণ সেবা প্রতিষ্ঠান-এর মাধ্যমে দরিদ্র, অসহায়, বঞ্চিত এবং অভাবগ্রস্ত শিশুদের খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার সেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করতে এবং নিঃস্বার্থ সেবার মাধ্যমে ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদ লাভ করতে ভক্তদের উৎসাহিত করা হয়।

যোগিনী একাদশী আত্মশুদ্ধি, ভক্তি, শৃঙ্খলা এবং সেবার এক পবিত্র উৎসব। এই ব্রত ভক্তদের ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদ লাভ, পাপমুক্তি এবং দানধর্মের মাধ্যমে সামাজিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেয়।

শ্রদ্ধা, ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গে এই ব্রত পালন করলে তা আধ্যাত্মিক উন্নতি, সুখ, সমৃদ্ধি এবং অন্তরের শান্তির পথ সুগম করে।

X
Amount = INR