28 August 2026

শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী ২০২৬: তারিখ, শুভ মুহূর্ত, পূজা পদ্ধতি, উপবাস ও দই-হাঁড়ির গুরুত্ব

Start Chat

যখনই পৃথিবীতে অধর্ম বৃদ্ধি পায়, তখন ধর্ম রক্ষা এবং ভক্তদের কল্যাণের জন্য ভগবান অবতার গ্রহণ করেন। দ্বাপর যুগেও যখন অত্যাচার ও অধর্ম চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন ভগবান বিষ্ণু শ্রীকৃষ্ণের রূপে অবতার গ্রহণ করে ধর্ম প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছিলেন।

ভাদ্রপদ মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রোহিণী নক্ষত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। আজও তাঁর জন্মদিন কোটি কোটি ভক্তের কাছে বিশ্বাস, ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার এক পবিত্র উপলক্ষ।

শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মোৎসব হিসেবে পালন করা হয়। এটি শ্রীকৃষ্ণ জন্মোৎসব এবং গোকুলাষ্টমী নামেও পরিচিত। মথুরা, বৃন্দাবন, গোকুল ও দ্বারকা সহ দেশের বিভিন্ন কৃষ্ণ মন্দিরে এই দিনে বিশেষ পূজা, ভজন, কীর্তন এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী ২০২৬ কবে?

২০২৬ সালে শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর পবিত্র উৎসব ৪ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার পালন করা হবে। এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বালস্বরূপ অর্থাৎ লাড্ডু গোপালের বিশেষ পূজা করা হয়।

জন্মাষ্টমীর পূজার শুভ সময় ৪ সেপ্টেম্বর রাত ১১:৫৭ মিনিট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর রাত ১২:৪৩ মিনিট পর্যন্ত থাকবে। এই মধ্যরাত্রির সময়েই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মোৎসব পালন করা হবে।

জন্মাষ্টমীর উপবাসের পারণ ৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৬:০১ মিনিটের পর করা যেতে পারে।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মকথা

মথুরার রাজা উগ্রসেনের পুত্র কংস তাঁর বোন দেবকীর সঙ্গে বাসুদেবের বিবাহ দিয়েছিলেন। বিবাহের পর কংস যখন তাঁর বোনকে শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন, তখন আকাশবাণী হয় যে দেবকীর অষ্টম সন্তানই কংসের মৃত্যুর কারণ হবে।

এই কথা শুনে কংস ভীত হয়ে দেবকী ও বাসুদেবকে কারাগারে বন্দি করেন। দেবকীর সন্তানদের কংস একে একে হত্যা করতে থাকেন। কিন্তু যখন দেবকীর অষ্টম সন্তান হিসেবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন, তখন কারাগারের দরজা আপনা থেকেই খুলে যায় এবং প্রহরীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

বাসুদেব নবজাতক শ্রীকৃষ্ণকে একটি ঝুড়িতে রেখে উত্তাল যমুনা নদী পার হয়ে গোকুলে পৌঁছান। গোকুলে নন্দ বাবার বাড়িতে যশোদা একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণকে যশোদার পাশে শুইয়ে সেই কন্যাশিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসেন।

কংস যখন সেই কন্যাশিশুটিকে হত্যা করতে চাইলেন, তখন সে যোগমায়ার রূপ ধারণ করে আকাশে বিলীন হয়ে যায়। যোগমায়া কংসকে সতর্ক করে বলেন যে তার বিনাশকারী ইতিমধ্যেই জন্মগ্রহণ করেছেন।

পরবর্তীতে গোকুলে নন্দ ও যশোদা শ্রীকৃষ্ণকে নিজেদের সন্তান হিসেবে অত্যন্ত ভালোবাসার সঙ্গে লালন-পালন করেন।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মহিমা

শ্রীকৃষ্ণ প্রেম, করুণা, জ্ঞান, নীতি ও ধর্মের প্রতীক। শৈশবে তিনি দুষ্টু-কানহা এবং গোপীদের প্রিয় হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আবার কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি অর্জুনের সারথি হয়ে তাঁকে ধর্ম ও কর্মের শিক্ষা দিয়েছিলেন।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানবজীবনকে কর্ম, ভক্তি ও ধর্মের পথ দেখিয়েছেন। তাঁর শিক্ষা হলো, মানুষের নিজের কর্তব্য থেকে কখনও পিছিয়ে যাওয়া উচিত নয় এবং কর্মের ফলের চিন্তা না করে ধর্মের পথে নিজের কর্তব্য পালন করে যাওয়া উচিত।

তাই জন্মাষ্টমী শুধুমাত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম উদযাপনের দিন নয়; তাঁর দিব্য শিক্ষা ও বার্তাকে আমাদের জীবনে গ্রহণ করার একটি সুযোগও বটে।

জন্মাষ্টমীর উপবাস কীভাবে পালন করবেন?

জন্মাষ্টমীর উপবাস ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে নেওয়া একটি পবিত্র সংকল্প। উপবাস পালন করতে চাইলে সকালে স্নান করে পরিষ্কার পোশাক পরুন এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করে উপবাসের সংকল্প নিন।

নিজের স্বাস্থ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী উপবাস পালন করা উচিত। যারা নির্জলা উপবাস করতে সক্ষম, তারা জল পান না করে উপবাস করতে পারেন। অন্যরা ফলাহার বা সাত্ত্বিক খাবার গ্রহণ করে উপবাস পালন করতে পারেন।

ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী, উপবাসের সময় শস্য ও সাধারণ খাবার না খাওয়ার রীতি রয়েছে। সারাদিন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নাম জপ করতে পারেন অথবা কৃষ্ণ ভজন ও কীর্তন শুনতে পারেন।

সন্ধ্যায় স্নান করে জন্মাষ্টমীর পূজার প্রস্তুতি নিন। মধ্যরাতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মের পর পূজা, অভিষেক, আরতি ও ভোগ নিবেদন করুন।

এরপর নিজের উপবাসের প্রথা এবং স্থানীয় পঞ্জিকায় উল্লেখিত পারণ সময় অনুযায়ী উপবাস ভঙ্গ করুন।

উপবাস ভঙ্গের সময় ভগবানের প্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন। সম্ভব হলে কোনো দরিদ্র বা অভাবী মানুষকে খাবার বা দান দিয়ে নিজের ভক্তি নিবেদন করুন।

জন্মাষ্টমীতে পূজা কীভাবে করবেন?

জন্মাষ্টমীর দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বালস্বরূপ অর্থাৎ লাড্ডু গোপালের পূজা করুন। বিশ্বাস করা হয় যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মধ্যরাতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাই রাত ১২টার কাছাকাছি সময়ে তাঁর জন্মোৎসব ও বিশেষ পূজা করার প্রথা রয়েছে।

পূজার পদ্ধতি:

  • পূজার স্থান সাজান: একটি পিঁড়ির ওপর হলুদ বা লাল কাপড় বিছিয়ে তার ওপর লাড্ডু গোপালকে প্রতিষ্ঠা করুন। ভগবানের জন্য ফুল দিয়ে সুন্দর দোলনাও সাজাতে পারেন।
  • বালগোপালকে স্নান করান: রাতের পূজার সময় প্রথমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে পঞ্চামৃত দিয়ে স্নান করান। পঞ্চামৃত সাধারণত দুধ, দই, ঘি, মধু ও চিনি দিয়ে তৈরি করা হয়। এরপর গঙ্গাজল দিয়ে স্নান করান।
  • সাজসজ্জা করুন: ভগবানকে নতুন ও পরিষ্কার পোশাক পরান। চন্দন, রোলি ও অক্ষত দিয়ে তিলক করুন। ময়ূরপুচ্ছ, বাঁশি ও তুলসী পাতা নিবেদন করুন।
  • ভোগ নিবেদন করুন: লাড্ডু গোপালকে মাখন-মিশ্রি, ধনিয়ার পঞ্জিরি, ফল, মিষ্টি এবং অন্যান্য সাত্ত্বিক খাবার ভোগ হিসেবে নিবেদন করুন। ভোগে অবশ্যই তুলসী পাতা রাখুন।
  • মধ্যরাতে জন্মোৎসব পালন করুন: রাত ১২টার সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মের মুহূর্তে শঙ্খ ও ঘণ্টা বাজিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। বালগোপালকে দোলনায় দোলান এবং ভজন ও কীর্তনের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের জন্মের আনন্দ উদযাপন করুন।
  • আরতি করুন: প্রদীপ ও ধূপ জ্বালিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরতি করুন। শেষে পরিবারের সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি এবং সমগ্র বিশ্বের কল্যাণের জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করুন।

জন্মাষ্টমী ও দই-হাঁড়ির ঐতিহ্য

শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলার মধ্যে মাখন চুরির লীলা সবচেয়ে আকর্ষণীয় বলে মনে করা হয়। বাল গোপালের মাখন ও দই খুব প্রিয় ছিল। তিনি তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে গোপীদের বাড়ি থেকে মাখন চুরি করে খেতেন। তাই তাঁকে ভালোবেসে ‘মাখন চোর’ বলা হয়।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই বাল্যলীলার স্মরণে জন্মাষ্টমীর সময় দই-হাঁড়ির আয়োজন করা হয়।

বিশেষ করে মহারাষ্ট্র ও গোয়ায় এই ঐতিহ্য অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে পালন করা হয়। দই বা মাখনে ভরা একটি হাঁড়ি অনেক উঁচুতে ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং যুবকদের দল মানব পিরামিড তৈরি করে সেই হাঁড়ি ভাঙার চেষ্টা করে।

‘গোবিন্দা আলা রে’ ধ্বনিতে চারপাশের পরিবেশ কৃষ্ণভক্তিতে ভরে ওঠে।

জন্মাষ্টমীতে সেবা ও দান করুন

শাস্ত্র এবং ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যে দান ও সেবাকে সবসময় পুণ্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণও মানবজীবনে করুণা ও পরোপকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাই জন্মাষ্টমীর পবিত্র দিনে অভাবী ও প্রয়োজনমতো মানুষকে সাহায্য করা ভগবানের প্রতি সত্যিকারের ভক্তি প্রকাশের একটি সুন্দর মাধ্যম হতে পারে।

এই দিনে দরিদ্র ও প্রয়োজনমতো পরিবারকে খাবার খাওয়াতে পারেন, অসহায় মানুষকে সাহায্য করতে পারেন অথবা কোনো অভাবী মানুষের জীবনে আনন্দ আনার চেষ্টা করতে পারেন। এই ধরনের মানবিক কাজ আধ্যাত্মিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ভগবানকে শুধু মন্দিরেই নয়, আমাদের সাহায্যের প্রয়োজন এমন মানুষের সেবার মধ্যেও অনুভব করা যায়।

জন্মাষ্টমী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবনে যখন অধর্ম ও অন্ধকার বৃদ্ধি পায়, তখন ঈশ্বরের কৃপা ও আলোর প্রকাশ অবশ্যই ঘটে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জীবন আমাদের শেখায় যে ভালোবাসার মধ্যে শক্তি রয়েছে, ধর্মের মধ্যে বিজয় রয়েছে এবং নিঃস্বার্থ কর্মই জীবনকে সার্থক করে তোলে।

এই জন্মাষ্টমীতে ভালোবাসা ও ধর্মের বার্তাকে আমাদের জীবনের অংশ করে নেওয়ার সংকল্প করি।

বাড়িতে লাড্ডু গোপালকে স্বাগত জানাই, কৃষ্ণের নাম স্মরণ করি, অভাবী মানুষের সেবা করি এবং নিজের অহংকার, ক্রোধ ও নেতিবাচকতা ত্যাগ করে ভালোবাসা ও মানবতার আলো জ্বালাই।

সবশেষে শ্রীকৃষ্ণের চরণে প্রণাম জানিয়ে—

কৃষ্ণায় বাসুদেবায় হরয়ে পরমাত্মনে।
প্রণতঃ ক্লেশনাশায় গোবিন্দায় নমো নমঃ॥

জয় শ্রীকৃষ্ণ!

X
Amount = INR